সোনার মানুষ

তেথুলিয়া বাজার থেকে ট্রলার ছাড়ে আমাদের। মোজাম্মেল মাঝির ট্রলার।গাজী কালুর নাম বলে যাত্রা শুরু করে।কারণ মাঝে মাঝেই হাওড়ে আফাল(ডেউ) উঠে।আসমানের মত উচুঁ সে আফাল।চারিদিকে যতদূর চোখ যায় পানি ছাড়া আর কিছু দেখার উপায় নেই। নৌকা ছাড়ার আধা ঘন্টা পরেই পৌঁছে যাই এরকম হাওড়ে।সাথে সাথে শুরু হয় বৃষ্টি। দেখি আস্তে আস্তে মলিন হয়ে আসছে শাহীন ভইয়ের মুখ।

ফেস বাংলাদেশের কর্ণধারি এই শাহীন ভাই। বাংলাদেশের প্রতান্ত এলাকায় ঘুড়ে ঘুড়ে বেড়ান। শুধু একা নয় দলবল নিয়ে। দূর্গম কিন্তু সৈৗন্দের্যে ভরপুর এরকমই গ্রাম, পাহাড়, হাওড়েরর বুকে ঘুড়ে বেড়ান তিনি।এবারও বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হাওড় বেসিন এলাকা পাড়ি দেয়ার পরিকল্পনা করেছে সে। মোহনগঞ্জ থেকে কুলিয়ারচর।সময় লাগবে ২দিন। পথ সম্পর্কে স্পর্ষ্ট কোন ধারণা নেই মাঝির।বৃষ্টির সাথে শুরু হলো বাতাস। আফাল কাকে বলে। ডেউয়ের পরে ঢেউ। এই ‍বুঝি উল্টে যায় আমাদের ট্রলার। সাতার না জানা মেরাজ ভাই শক্ত করে ধরে আছে পাটাতন। হাওড়ের মাঝখানে দ্বীপের মতো জেগে থাকা একটা বাড়ির ঘাটে নোঙ্গর ফেলে মাঝি। ঘন্টা তিনেকের মতো আমাদের সেইখানেই আটকে থাকতে হয়। বাতাশ কমলে সিধান্ত হয় আজকে আর যাবো না। কাছেই গাগলাজুর বাজারে গিয়ে থাকবো।

বাজারের ঘাটে নামতেই পানিতে প্রায় নিমজ্জিত একটা স্কুল চোখে পড়ে আমদের। নেমেই আমি তার কিছু ছবি তুলি।আমাকে দেখে একজন প্রবীন লোক এগিয়ে আসেন।তিনেই এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা এবং বর্তমানে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। পরিচিত হই তাঁর সাথে। নাম মো আব্দুল মজিদ মাস্টার । ৭৩ বছর বয়স। এখনো মজবুত গঠন তাঁর শরীরের। চোখে চসমা নেননি। জীবেনের শেষ বেলায় এসে ২০০৫ সালে নিজের গ্রামে নিজেদের জমিতেই স্থপান করেন এই ভাটি বাংলা হাই স্কুল।

এখন তার দিন কাটে এই বিদ্যালয়ের কাজ করে। নৈশপ্রহরি রাখার টাকা নেই । তাই নিজেই থাকেন। বিদ্যালয়ের একটা রুমে। ৩ ছেলে প্রতিষ্ঠিত। দুই ছেলে বউ-ছেলে মেয়ে নিয়ে ঢাকায় থাকেনেআরেক ছেলে থাকেন করাচিতে। তারা মাসে মাসে টাকা পাঠান । সেই টাকা দিয়ে তিনি স্কুলের খরচ চালন।

আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছি তার গল্প। ভাটি বাংলার প্রবাদ পুরুষ বিখ্যাত বাউল শিল্পি উকিল মুন্সির কাছে তার হাতেখড়ি। যৌবনে পড়েছেন। কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজে।সেখান তার সহপাঠি ছিলেন দেশের বর্তমান রাষ্টপতি আব্দুল হামিদ।ঐ কলেজেই পড়াকালনি সময়ে একবার এক বন্ধে বাড়িতে আসেন।দেখেন ৮/৯ বছরের এক ছেলে কাজ করছেন তাদের বাড়িতে। বড় ভাই আজিজ আহম্মেদ পরিচয় করিয়ে দেয়। খালেক, পাশের গ্রামেই থাকে।খুবই ভালো ছাত্র। এইবার বৃত্তি পরীক্ষা দিবে।তখন আমার চোখে পানি এসে যায়।পণ করি জীবনে মাস্টারি ছাড়া আর কিছু করবো না।খালেক এখন বউ-সন্তান নিয়ে আমেনিকায় থাকে।ও নানা সময়ে আমাদের সহযোগিতা করে থাকে। ওর টাকা দিয়েই এই ভবনটা করা হয়েছে। তাই এই ভবনের নামও রাখা হয়েছে তার নামে ‘ খালেক ভবন”।

’১৯৬৫ সালে রাম গোপালপুর পিজেকে হাইস্কুলে জয়েন করি। সেই থেকে শুরু শিক্ষকতা জীবনেল। এরপর শ্যম ইউনিয়ন হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি।১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠান করি ময়মনসিংহ জেলা পরিষদ হাই স্কুল।২০০২ সালে সেখান থেকে অবসর নেই। মাঝখানে ২২ বছর ময়মনসিংহ শিক্ষক সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়ত্ব পালন করি। আর জীবনের এই শেষ বেলায় নিজের গায়ে প্রতিষ্ঠা করি এই বিদ্যালয়ের। এখন এখানেই কাটে আমার দিন রাত। অবৈতনিক মিক্ষক হিসেবই এখান থেকেই আমি আমার শেষ নিশ্বাস ত্যাগ রকরতে চাই।

স্যারের গল্প শুনতে শুনতেই সন্ধ্রা গাড় হয়ে আসে। আমার চোখের পাতাও ভারি হয়ে যায়। জীবনে প্রথম অন্দকারকে আর্শিবাদ মনে হলো। যে বয়সে মানুষ নাতিপুতির সাথে কাটায় একটু অবসর জীবন। চায় একটু আরাম আয়েসের আর সেই বয়সেই কিনা সে বেছে নিয়েছে এই কঠিন ব্রত। এই সোনার মানুষেরা আছে বলেই এখনো হয়তো আমাদের এই দেশটা টিকে আছে।

রাত ঘনিয়ে আসছে।হাওড়ের ছলাৎ ছলাৎ জলে দুলছে আমাদের ট্রলার। হেরিকেনের মৃদু আলোয় মঞ্জিল বয়াতীর কন্ঠে শুনছি উকিল মুন্সির গান।‘আমারে নিল না নাইর পানি থাকতে তাজা’ ।হাওড়ের লিলুয়া বাতাশ লাগছে আমাদের গায়ে।

ছবি : ফরিদী নোমান

Facebook Twitter LinkedIn Email

আপনার মতামত লিখুন :