শহীদ মিনার

গ্রামের বড় ভাইদের অনুরোধে একটি নাটিকা লিখেছিলাম এইবারের বইমেলার জন্য । নাটিকাটি আজকে মঞ্চায়িত হবে। আপনাদের সকলের নিমন্ত্রণ রইলো । 

 

শফিক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বয়স : ২২/২৩

বাবা (জব্বার মিয়া) : মধ্যবয়সী। মাথায় কাচা-পাকা চুল। লুঙ্গি ও ফতুয়া পরিহিত। কাঁধে গামছা।চাপদাড়ি কিন্তু খোচা খোচা

মাতাব্বর : ঐ বয়সী। পায়জামা –পাঞ্জাবী পরিহিত। মাথায় জিন্না টুপি।মুখে চাপ দাড়ি। হাতে লাঠি।কাঁধে চাদর।

মাস্টার : ঐ বয়সী। পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিহিত। চোখে চশমা। হাতে ছাতা।

সাজ্জাদ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।শফিকের বন্ধু।

নোমান :ছাত্রনেতা । ২৪/২৫।

গোলাম। শফিকের বন্ধু। ক্রসবেল শার্টপেন্ট ।

১জন পুলিশ অফিসার ও সাথে ৩জন পুলিশ।

প্রথম দৃশ্য

 

(নেপথ্যে বাজবে রেলগাড়ির শব্দ ও হুইসেল। শফিক ও বাবা’র মঞ্চে প্রবেশ)

শফিক : বাবা অনেক দূর তো আসলে এইবার বাড়ি যাও

বাবা : স্টেশন পর্যন্ত যাই বাবা

শফিক : না বাবা তোমাকে তো আবার ফিরতে হবে, মা চিন্তা করবে তুমি এবার যাও। আমার জন্য চিন্তা করো না। শরীরের প্রতি খেয়াল রেখো। এই তো আর এক বছর আমার মাস্টার্সটা শেষ হলে তোমার আর কোন চিন্তা নেই। রাবেয়াকে একটা ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দিবো। ও হ্যা মারুফকে কিন্তু মনোযোগ দিয়ে পড়তে বলবে।মা’র দিকেও খেয়াল রেখো বাবা।

বাবা :  হ বাবা, তোর দিকেই তো আমারা চাইয়া আছি। তুই বড় চাকরি করবি। অনেক অনেক বড় সাহেব হবি। আমাদের  কোন দুঃখ থাকবে না।

(মাতাব্বরের প্রবেশ)

মাতাব্বর : কে শফিক বাবা নাকি?

শফিক : স্লালামালাইকুম চাচাজান।

মাতাব্বর : অলাইকুম আসছালাম।তা তোমার লেখাপড়া কেমন চলছে বাবা?

শফিক : জি, ভাল চাচাজান।

মাতাব্বর: তা কুলসুমের সাথে তোমার দেখা হয়েছিল বুঝি?

শফিক : হ্যা , না , মানে হ্যা , দেখা হয়েছিল। বাবা আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে আমি আসি।আসি চাচাজান। স্লালামালাইকুম।

(শফিক হন্তদন্ত হয়ে ছুটে যাবে। সবাই এক যোগে হেসে উঠবে)

মাতাব্বর : লজ্বা পেয়েছে।( কয়েকবার বলবে আর হাসবে, সবাই সাথে সাথে হাসবে)

বাব : তা মাতাব্বর সাব কই যাচ্ছেন ?

মাতাব্বর : টাউনে? ঢাকা শহরে কি নিয়া যেন গন্ডোগোল হচ্ছে।

বাবা : গন্ডোগোল?

মাতাব্বর :  হু , গন্ডোগোল । আর বলো না। মালাউনরা কি আমাদের শান্তিতে থাকতে দিবে।এই তুমিই কও দেখি জব্বার মিয়া- এই তো কদিন হলো দেশটা স্বাধীন হইছে। দেশটা স্বাধীন করল কেডা। কও কেডা?

( জব্বার মিয়া মাথা চুলকাবে)

মাতাব্বর : জিন্না সাব।তো ওনি কি আমাগোর খারাপ চাইতে পারেন? ‍ওনি কইছে পাকিস্তানের ঐক্য থাকনের লিগা আমাগো হগলের একটা ভাষা হওন উচিৎ।সেইটা হইল উর্দু ভাষা । পাকসাফ একটা ভাষা । আরবি হরফে লিখা। আর ইউনিভার্সিটির পোলাপাইনেরা  ঐ হিন্দু-মালাউনগো কথা হুইনা- হ্যাগো সাথে নাচা শুরু কইরা দিছে।কয় কিনা বাংলারেও নাকি করতে হবে  রাষ্ট্রভাষা। তাগো সাথে জুটছে ঐ কুমুনিষ্ট মাস্টারগুইলা।–

বাবা : তা পোলাপানগুলা যা চায় তা মাইনা নিবারই পারে।

মাতাব্বর : তুমি যে কি কও জব্বার মিয়া। তাইলে পাক পাকিস্তানের ঐক্য দূর্বল হয়ে যাবে না? এতে কাগো লাভ ? কও দেহি?লাভ হইল ঐ মালাউন ইন্ডিয়ার।যাউগগা এসব কথা আরেকদিন হবে। খান বাহাদুর সাহেব মিটিং ডেকেছেন? দেরি হলে আবার রাগারাগি করবেন?

বাবা : হ, আমি যাই । আইজ উত্তরের চরায় আবার হাল দিতে অইব।

লও লও যাইগা।(সকলের প্রস্থান)

দ্বিতীয় দৃশ্য

(বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দায় দাড়িয়ে থাকবে শফিক । তাকে ক্রস  করে যাবে একটি মিছিল।)

রাষ্ট্র ভাষা, রাষ্ট ভাষা,

বাংলা চাই, বাংলা চাই।

আমাদের দাবি, আমাদের দাবি

মানতে হবে, মানতে হবে।

রাষ্ট্র ভাষা , রাষ্ট্র ভাষা

বাংলা চাই, বাংলা চাই

মোদের গরব, মোদের আশা

আ-মরি বাংলা ভাষা

(মিছিল চলে গেলে ঘাসের উপর বসে পড়বে শফিক। ভিতরের বুক পকেট থেকে বের করবে একটি চিঠি। গন্ধ শুকে পড়তে শুরু করবে।)

কি নামে ডাকবো তোমায় প্রিয়তম। কতো কিছু বলে যে তোমায় ডাকতে ইচ্ছে করে। অথচ তোমার সামনে গেলে আমি সব ভুলে যাই। সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায়। কিছুই গুছিয়ে বলতে পারি নি তখন? আর তুমিও কেমন অসভ্য। কেমন ডেব ডেব করে তাকিয়ে থাকো আমার দিকে। আমার বুঝি লজ্বা করে না।

এই তোমার মনে আছে সেই প্রথম দিনের কথা। সেই দিন পলাশ গাছটাতে কতো ফুল ফুটেছিলো।আমি দাড়িয়ে ছিলাম অশোকের নীচে। অশোক গাছটা লাল ফুলে ফুলে ছেয়ে ছিলো।আর তুমি কি না – একটা শিমুল ফুল এনে-হাদারাম একটা।

আর শোন আমাদের ঘরটা কিন্তু হবে দখিনদুয়ারি।সামনে থাকবে ‍ফুলের বাগান। শিউলি, জুঁই, হাসনেহেনা, আর একটা ছাতিম। অঘ্রানে ছাতিমের গন্ধে মম করবে আমাদের ঘড়।আর হ্যা একটা বকুল আর কৃষ্ণ চূড়াও লাগাতে হবে কিন্তু।

বাবা বলছিলেন সামনের তোমার পরীক্ষা শেষ হলেই ..

(চিঠি কেড়ে নিয়ে পড়া শুরু করবে সাজ্জাদ। ওরা দু’জন চিঠি নিয়ে পারাপারি করবে)

শফিক : এই দিয়ে দে কিন্তু। ভালো হবে না বলছি। দে দে । তোর দোহায় লাগে দোস্ত, দে।

( চিঠিটা পড়ার চেষ্টা করবে । আর শফিক চিঠিটা কেড়ে নিবে।)

সাজ্জাদ :  শালা ডুবে ডুবে জল খাওয়া হচ্ছে, না? ( এইবলে শফিকের মাথায় হাত দিয়ে মৃদু টোকা দিবে। আর হাসবে, পকেট থেকে ১টা সিগারেট বের করে ধরাবে। ধুয়া উড়াতে উড়াতে বলবে)

বাড়ির সবাই কেমন আছেরে ? খালাম্মা খালুজান সবাই ভালো আছে?

শফিক : হু সবাই ভালো আছে।

সাজ্জাদ : আর ময়না পাখি?

শফিক : দূর শালা। ( এরপর দূজনেই হেসে উঠবে।)বাদ দে এসব কথা ।ইউনিভার্সিটির কি খবর ? বল।

সাজ্জাদ : জানিস না জিন্না সাব সেদিন কার্জন হলে এসেছিলো। বলে কিনা উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। ছাত্ররাও সেদিন মুখের উপর বলে দিয়েছে ‘নো , নো’ ।এইবার বুঝো ঠেলা। ছাত্ররা বিষণ খেপে উঠেছে। এইবার বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যদা না দিয়ে পারবেই না।মুধু থেকে মিছিল বেরিয়ে ছিলো । আমি মিছিল থেকেই আসলাম। জানিস ঐ যে ঐ মেয়েটা । ঐ মেয়েটাও এসেছিলো মিছিলে

শফিক : কোন মেয়েটারে?

সাজ্জাদ : শালা মারবো এক থাপ্পর। নেকামি করা হচ্ছে।

গোলাম : এই যে তোমরা এইখানে? তা কেমন আছে সবাই।

শফিক ও সাজ্জাদ : ভালো তুই?

গোলাম : ভালো আর থাকা গেল কই ? শুধু মিছিল আর মিছিল।

সাজ্জদ : কেন তুই মিছিলে যাস না?

গোলাম : না

সাজ্জাদ : না!(দুই জন একসাথে)

গোলাম : হু, বলতো কি পেয়েছে নেতারা? নতুন একটা স্টেট জন্ম নিল ।এখনই ডিবাইডেড শুরু করার কোন মানে হয়?

সাজ্জাদ : ডিভাইডেড আমরা করছি না । ওরা করছে। আমরা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু ।আমরা মোট জনগোষ্ঠির ৫৬ ভাগ ।আর তা ছাড়া উর্দু পাকিস্তানের কোন এলাকার ভাষা না। সম্ভ্রান্ত কিছু মুসলিম পরিবারের ভাষা কি করে একটা স্টেটের ভাষা হতে পারে। আর আমরা বলছি না যে, বাংলাকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বানাতে হবে। আমরা বলছি বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বানাতে।

গোলাম : মানছি তোর কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু এটাও তো তোদের ভাবতে হবে । এটা একটা মুসলিম কান্ট্রি। ইন্ডিয়া কখনো চায় না পাকিস্তান টিকে থাকুক। হিন্দু জমিদারেরা এতো দিন আমাদের রক্ত শোষণ করেছে।এখন চাচ্ছে এই রাস্ট্রটা ভেঙ্গে দিতে।

শফিক : শোন বিষয়টা ধর্মের না। বিষয়টা হলো অর্থনীতির। উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে বাঙ্গালিরা শিক্ষায় পিছিয়ে পড়বে।ফলে চাকরি বাকরিও পাবে না। পাবে সব পাঞ্জাবিরা। আর এই বিষয়টাই দেখ না কেন? নির্বাচনে মুসলিমলীগ কোথায় সবচেয়ে বেশি আসন পেযেছে? এই বাংলায়। বাংলায় মুসলিম লীগ এতো আসন না পেলে কিন্তু পাকিস্তান কায়েমই হয় না।

গোলাম : তোরা জানিস না হিন্দু জমিদারেরা আমাদের উপর কতো অত্যাচার করেছে। আমাদেরকে ওরা মানুষই মনে করতো না। আমাদের ছায়া মাড়ালে, আমাদের ছোয়া খেলে নাকি ওদের জাত যেত। আমরা নিজেরা দেখেছি হেমনগরের জমিদারদের অত্যাচার।নলিন বাজারে মিষ্টি খেতে গেলে আমাদের কখনো প্লেট দিতো না।আমরা ফকিরের মতো হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকতাম। কখন একটা মিষ্টি দিবে? কেন করতো জানিস ? কারণ আমরা মুসলমান। আর এখন, এখন এই শিশু রাষ্ট্র্যটার গলা টিপে হত্যা করতে চাচ্ছে।তাই সামনে নিয়ে এসেছে এই ভাষার প্রশ্ন। এইসবই ইন্ডিয়ার ষড়যন্ত্র।আর এই ষড়যন্ত্রে না বুঝে পা দিচ্ছে আমাদের ছাত্রসমাজ।

 

সাজ্জাদ : শোন, শোন  তুই জমিদারের কথা বললি না। এটা সত্য বাংলায় হিন্দু জমিদারের সংখ্যা বেশি ছিল । আর রায়াতের মধ্যে বেশি মুসলমান। তাই নির্যাতিতও হয়েছে মুসলমান কৃষকই বেশি। কিন্তু যেইসব এলাকায় মুসলমান জমিদার ছিলো সেখানে কি মুসলমান কৃষকেরা নির্যাতিত হয়নি?  শোন জমিদার জমিদারই। সে হিন্দুই হোক আর মুসলমানই হোক। তার কাজই হচ্ছে প্রজাদের অত্যাচার করা। আর ছোয়াছুয়ির কথা বললি না ? এই দোষেই তো ওরা এতোদিন বিদেশীদের গোলামী করেছে।কতো প্রাচীন একটা সভ্য জাতি অথচ কতো বিদেশীরা ওদের শাসন করলো, শোষন করলো । ওদের এই পাপেই তো ভারত  ভাগ হলো।

 

(নোমানের হন্তদন্ত হয়ে মঞ্চে প্রবেশ)

 

নোমান : তোমরা এখানে, আর  আমি তোমাদের খুজেঁ মরছি। কাল ১৪৪ ধারা জারি করেছে। নেতারা ১৪৪ ধারা ভাঙ্গতে নিষেধ করেছে। রাত্রে গাজি ভাই আমতলায় মিটিং ডেকেছে। যে করেই হোক ১৪৪ ধারা ভাঙ্গতে হবে। ওরা আর আমাদের দাবিয়ে রাখতে পারবে না। আমাদের দাবি মানতেই হবে।আমরা ব্রিটিশদের তাড়িয়েছি প্রয়োজন হলে ওদেরও তাড়াবো। সাজ্জাদ রাত্রে চিকা মারতে হবে। শফিক কাল মিছিলে এসো কিন্তু। গোলাম তুমিও এসো।আমি চলি আমার জরুরি কাজ আছে।

( চলে যেতে উদ্যোগ নিবে। আবার ফিরে আসবে)

ও হ্যা , সাজ্জাদ । এই পোস্টারগুলো সদরঘাট, বাহাদুরশাহ পার্ক এলাকায় পৌঁছে দিতে হবে। বিউটি বোডিং এ আমাদের কিছু কর্মী আছে ওরাই এগুলো লাগাবার ব্যবস্থা করবে ।চলিরে । কাল মিছিলে দেখা হবে।(প্রস্থান)

সবাই একসাথে : চল চল আমরাও যাই।

৩য় দৃশ্য

মিছিলে মিছিলে প্রকম্পিত শহর। গলি থেকে মিছিল আসছে।বিভিন্ন স্কুল থেকে মিছিল আসছে। সকলের হাতে বিভিন্ন স্লোগান সম্বলিত প্লেকার্ড ।

শফিক ও সাজ্জাদ দাড়িয়ে ছিলো। একটা মিছিল পার হয়ে গেল তাদের।

সাজ্জাদ : ঐ দেখ, দেখ ঢাকার সব স্কুল কলেজ থেকে মিছিল আসছে। মিছিলে মিছিলে ছেয়ে যাচ্ছে ইউনিভার্সিটি। ঢাকা আজ মিছিলের নগরী। মিছিল আসছে নবকুমার থেকে, আসছে জগন্নাথ থেকে, আরমানিটোলা, বাবুবাজার, ফরাসগঞ্জ থেকে, দেখ দেখ ইডেনের মেয়েরাও এসেছে।আমাদের বোনেরাও দাড়িয়েছে আমাদের পাশে। এবার আর আমাদের দাবি না মেনে উপায় নেই, উপায় নেই মোনায়েম খাঁ।দাবি তোমাদের মানতেই হবে।

জানিস, জানিস শফিক ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার জন্য প্রথম মিছিলটা মেয়েরা করেছে ।আয়, আয় আমরাও মিছিলে যাই ।মিছিলে মিছিলে কাঁপিয়ে তুলি এই ধরণি

 

শফিক : না ,তুই যা

সাজ্জাদ : চল না, চল, কতো মানুষ যাচ্ছে

শফিক : আমার ভয় করে । আমার উপর তাকিয়ে আছে একটা পরিবার। পুরো একটা গ্রাম।জানিসতো ঐ গ্রাম থেকে আমি একা এখানে পড়তে এসেছি।আমার বাবার স্বপ্ন আমি বড় অফিসার হবো। গ্রামের মানুষের বিশ্বাস আমি তাদের মুখ উজ্জ্বল করবো।তাই ভয় করে মিছিলে গেলে যদি কিছু হয়।( বলতে বলতেই একটা মিছিল আসবে। সাজ্জাদ জোর করে শফিককে নিয়ে যাবে মিছিলে। পরে শফিক স্লোগানে নেতৃত্ব দেয়া শুরু করবে।)

মঞ্চে ৩জন পুলিশ টহল দিচ্ছে  । কিছুক্ষণ পরে প্রবেশ করবে পুলিশ ইন্সপেক্টর।)

ইন্সপেক্টর : শহরের কি অবস্থা?

সব পুলিশ : স্যার, শুধু মিছিল আর মিছিল

ইন্সপেক্টর : হু

(কিছুক্ষণ পরেই শফিকের নেতৃত্বে মঞ্চে প্রবেশ করবে মিছিল।পুলিশ পথ রোধ করে দাড়াবে তাদের।)

পুলিশ : স্লোগান থামান বলছি।

শফিক : না আমরা থামবো না। আমরা স্লোগান দিবো।আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা স্লোগান দি বো। কণ্ঠনালির সমস্ত শক্তি দিয়ে আমরা স্লোগান দিবো। স্লোগান দিয়ে দিয়ে কাপিঁয়ে দিবো জলুমশাহীর তখত-তাউস।(আবার স্লোগান দেয়া শুরু করবে)

পুলিশ : স্লোগান থামান বলছি। থামান বলছি । আমরা গুলি করতে বাধ্য হবো ।

( স্লোগান চলছে। গুলির শব্দ। সবাই পালাও পালাও বলে পালিয়ে যাচ্ছে। শফিকের বুকে গুলি লাগবে। সাজ্জাদ তাকে এসে জড়িয়ে ধরবে। নেপথ্যে বেজে উঠবে ওরা আমার মুখেরভাষা কাইরা নিবার চায়।গানটি বাজতে বাজতেই আরো কয়েকজন শফিক বলে মাঞ্চে ডুকবে। সবাই ওকে কোলে করে মঞ্চ থেকে নেমে আসবে।)

৪র্থ দৃশ্য 

মঞ্চে প্রবেশ করবে মাস্টার ও মাতাব্বর

মাতাব্বর : আপনে যাই বলেন মাস্টার, ছেলে পিলেগুলো কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি করছে।

মাস্টার : বাড়াবাড়ি মানে। বাড়াবাড়ি করছে তো ওরা। আমাদের ন্যয্য দাবি ওরা মানছে না।

মাতাব্বর : না মাস্টার সাব । আপনাকে তো মুসলিম উম্মার দিকেও তাকাতে হবে। পৃথিবীর সব চেয়ে বড় মুসলিম রাষ্ট্র বলে কথা।

মাস্টার : হু সেই জন্য আমরাই বেশি কষ্ট স্বীকার করেছি। আজকে বাংলাকে ভাগ করে দুই ভাগ করা হলো। বাপদাদা চৌদ্দপুরুষের ভিটা ছেড়ে চলে যেত হচ্ছে এদেশের হিন্দুদের। এইটা কখনো ভাবা যায়? ভালো ভালো মাস্টাররা সব চলে যাচ্ছে ওপারে। কি ভাবে যে স্কুল চালাচ্ছি আপনে জানেন না মাতাব্বর সাহেব।এই সে দিনও  হেমনগরের ব্যঙ্গা ডাক্টাররা চলে গেলেন। হঠাৎ করে ঘাটের পারে দেখা । জড়িয়ে ধরে কি কান্না। এই পাঁচ-দশ গ্রামের মধ্যে ব্যঙ্গা ডাক্তারের মতো ডাক্তার হবে?

মাতাব্বর : তা ঠিক আছে । কিন্তু বাংলা তো একটা হিন্দুয়ানি ভাষা।

মাষ্টার : ভাষার আবার জাত আছে নি?

মাতাব্বর : থাকবে না কেন ? এই যেমন ধরেন আমরা বলি পানি আর ওরা বলে জল

মাষ্টার :  হাহাহা…. , হাসালেন মাতাব্বর সাব, হাসালেন,( হাসতে হাসতে) শুনেন, শুনেন আপনাদের এই পানি কিন্তু বাংলা শব্দ না এটা হলো হিন্দি শব্দ। আর আমরাতো নিজেরাও জল ব্যবহার করি।

মাতাব্বর: আমরাও করি !

মাস্টার : আলবৎ করি, ১০০ বার করি। এই যে যেমন ধরেন, আমরা বলি জলযান, জলহাওয়া, কিন্তু কেউ কি পানিযান, পানি হাওয়া বলি? না, বলি না। আরো মজার কথা কি জানেন এই জলও কিন্তু বাংলা শব্দ না এইটা হলো সংস্কৃত শব্দ।

মাতাব্বর : বলেন কি মাস্টার সাব !

মাস্টার : আরো আছে, আরো আছে । এই যে আমরা নামাজ, রোজা বলি, এইগুলো কিন্তু আরবি শব্দ না । ফারসি শব্দ।মানে অগ্নি উপাসকদের শব্দ। তাতে তো আমাদের সমস্যা হচ্ছে না । যত দোষ এই বাংলা ভাষার।

বাবা : মাস্টার সাব , ও মাস্টার সাব , মাস্টার সাব… (বলতে বলতে মঞ্চে প্রবেশ করবে বাবা)

মাস্টার  : কি হইছে জব্বার মিয়া । এতো হাপাচ্ছো কেন?

বাবা : ঢাকাত নাকি গোলাগুলি হইছে। শফিকগো ইনভার্সিটিতে কয়েকটা পোলাও গুলি খাইছে।

মাতাব্বর : লা হাওলা ওয়ালা কুয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিউল আজিম। নাউজবিল্লাহ । কি কও এসব। এক মুসলমান আরেক মুসলমানরে গুলি করে কেমনে? এই সব নিশ্চই মালাউনগো প্রচারণা। ওরা দেশের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়। মারলে মারবো হিন্দুগোরে। মুসলমান ছাত্রদের মারবে কেন?

বাবা : না মাতাব্বর সাব। আমার মনটা কেমন কেমন যেন করে। শফিক যাওয়ার পর থেকেই কুত্তাটা কেমন কইরা হারা রাইত ভইরা বিলাপ করে। হেই বিলাপ হুইনা বুকের মধ্যে আচমকা কেমন জানি মোচড় দিয়া উঠে। দেহেন না শিমুলডালে কাওয়াগুইলা কেমন কাকা করতাছে। রাইতে খোয়াবের মধ্যে দেহি ক্যারা জানি আমার শফিকেরে একটা ছুড়ি নিয়া দৌড়াইতেছে। বাবা আমার কতো চেষ্টা করতাছে বাঁচবার নিগা। কিন্তু পারলো না। হারামিরা ছুড়ি দিয়া আমার শফিকেরে ফালা ফালা কইরা ফালাইলো।

মাতাব্বর : দূর , কিযে বলো । স্বপ্ন কখনো সত্য হয় নাকি? স্বপ্ন তো স্বপ্ন।আর কুকুর কাঁদলে অমঙ্গল হয় এইডা একটা কুসংস্কার।শোন এইবার শফিক বাপ আসলে আমার মেয়ে কুলসুমের সাথে ওর বিয়েটা দিয়ে …

(বাবার চোখ থাকবে ধূরে রাস্তার দিকে।কারা যেন একটা লাশ নিয়ে আসছে)

বাবা : মাস্টার সাব ঐগুলান কারা আহে?

মাস্টার : হ তাইতো দেখছি। একটা লাশ নিয়ে এক দল লোক এই দিকে আসছে।

মাতাব্বার : আমিও তো তাই দেখছি।

( কালেমা শাহাদৎ পড়তে পড়তে দর্শকদের মাঝখান থেকে কয়েকজন ছাত্র লাশ নিয়ে মঞ্চে প্রবেশ করবে)

সাজ্জাদ : এইটা কি শিমুলতলী গ্রাম? আমরা শফিকের লাশ নিয়ে এসছি। ভাষার দাবিতে মিছিল করতে গিয়ে পুলিশের একটা গুলি শফিকের বুকে..

বাবা : বাপ আমার ……………( কাদঁতে কাঁদতে ঝাপিয়ে পড়বে লাশের উপর)

(মাস্টার গিয়ে হাত বুলাবে বাবার মাথায়। মাতাব্বরের দিকে তাকিয়ে বলবে)

মাস্টার : মাতাব্বর সাব, দেখলেন – আপনার মুসলমান ভাইয়েরা কেমনে কইরা মুসলমান ভাইগোরে মারছে।দুনিয়ার ইতিহাসে কোথাও কি শুনেছেন নিজের মায়ের ভাষার সম্মান রক্ষা করবার জন্য এই ভাবে কারো গুলি খাইতে হইছে?

সাজ্জাদ : আমাদের শফিক মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার জন্য শহীদ হয়েছে। আমরা ওর পবিত্র আত্মার স্মৃতি রক্ষার জন্য এই গ্রামে একটা শহিদ মিনার বানাবো। যেখানে প্রতিবছর ফুল দিতে আসবে অনাগত কালের শিশুরা। তারা স্মরণ করবে ভাষার জন্য আত্মউৎসর্গকারী আমাদের শফিককে।

( সবাই লাশ কাঁধে নিয়ে প্রস্থান হতে থাকবে। নেপথ্যে বাজবে একুশের গান)

৫ম দৃশ্য

মঞ্চে একটা শহিদ মিনার বানানো থাকবে। একুশের গান গেয়ে সবাই ফুল দিবে তাতে

 

রচনায় : আবদুস ছাত্তার খান বাবু

রচনাকাল : ২৬-৩০/০১/২০১৫

Facebook Twitter LinkedIn Email

আপনার মতামত লিখুন :