লঙ্গরখানা ও আমাদের অভিজ্ঞতা ২০১৯

গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন থেকে আমরা একটা কথা বরাবরই বলে আসছিলাম – আমাদের সমস্যা আমরাই সমাধান করবো।স্বর্গ থেকে কোন দেবদূত এসে আমাদের সমস্যার কোন সমাধান দিয়ে যাবে না।গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন তা নানাভাবেই প্রমাণ দিয়ে এসেছে। চীন, নেপাল, অরুণাচল, আসাম থেকে ব্রহ্মপুত্রের পানি যেভাবে ধেয়ে আসছিলো ।অনুমান করা যাচ্ছিলো এবারের বন্যাটা ভয়াবহই হবে।কিন্তু তারজন্য রাষ্ট্রযন্ত্র কী প্রস্তুতি নিয়েছিলো তার বিচার একদিন জনগন ঠিকই করবে।
যমুনার পানি বাড়লেই তারাকান্দি থেকে ভূঞাপুর পর্যন্ত বাধঁটি হুমকীর মুখে পড়ে।সম্ভবত পাকিন্তান আমলে জেলা বোর্ড থেকে এই বাধঁটি নির্মাণ করা হয়।পরে ৯০ এর দশকে সরিষাবাড়ী সারকারখানা স্থাপিত হওয়ার ফলে এই বাধঁটি ঢাকা তারাকান্দি রোড হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যমুনা সারকারখানার সার উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছানো হয় এই রোড ব্যবহার করে।
৯০ এর পরে বড় বড় বন্যার হাত থেকে উত্তর টাঙ্গাইলকে রক্ষা করেছে এই বাধঁ? আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি ৮৮ সালে এই বাধেঁর নানা জায়গায় ভেঙ্গে গিয়েছিলো। ফলে এক রাতের মধ্যে পানি ঘাটাইল, গোপালপুর, কালিহাতিসহ ময়মনসিংহের কিছু কিছু জায়গা প্লাবিত হয়েছিলো । জানমালেরও অনেক ক্ষয় ক্ষতি হয়েছিলো।সেই অভিজ্ঞতা তাঁদের মনে অনেক আতঙ্কের সৃষ্টি করে।তাই বড় বন্যা হলেই ঐ এলাকার মানুষ আতঙ্কিত হয়ে যায় আবারো বাঁধ ভাঙ্গলো নাকি।
অনেকটা বেওয়ারিশ এই রোড।রাস্তার যত্ন-আত্নির ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগ কেউ এই রোডের দায়িত্ব নিতে চায় না।কিন্তু ফান্ড পেলে একই সাথে দুই সংস্থা আসে কাজ করতে। ২০১৭ সালের বন্যায় আমাদের এই অভিজ্ঞতা হয়েছে।
৮৮,৯৮, ২০১৭, ২০১৯ এর মতো বন্যায় ৮৮ ও ৯৮ সালে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হলেও ২০১৭ সালে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়নি।যদিও এলাকার জনগণ বারবার দাবি করে আসছিলো সেনামোতাযনের।২০১৯ সালে ভাঙ্গার পর সেনা মোতায়েন করা হয়।
৮৮ সালে বাঁধের কয়েক জায়গায়, ৯৮ এ বাহাদিপুর নামক স্থানে, ২০১৭ তে স্থলে, ২০১৯ এর টেপিবাড়ী নামক স্থানে বাঁধ ভেঙ্গে যায়। প্রতিবারেই এই বাঁধ ভাঙ্গার ফলে উত্তর টাঙ্গাইলে বন্যার ভয়াবহতা দেখা দেয়।
উজানে বন্যা হলে স্বাভাবিকভাবেই বন্যা আমাদের এখানে আঘাত হানবে। কিন্তু প্রতিবারই বন্যার সময় খেয়াল করা যায় বাঁধ রক্ষার কোন পূর্বপ্রস্তুতিই সংশ্লিষ্ট সংস্থার নেই ।স্থানীয় জনগণই যার যা আছে তাই নিয়ে বাঁধ রক্ষার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে।অনেক সময় দেখা যায় ভাঙ্গা কবলিত অংশে কর্তা ব্যাক্তিরা আসে সেলফি তুলতে।আবার পানি উন্নয়ন বোর্ড এমন একটি সংস্থা এই কাজে তাদের নিজস্ব জনবল নাই বললেই চলে। তারা ঠিকাদারকে দিয়ে কাজ করায় তাও আবার ফান্ড পাওয়ার পরে।ততক্ষণে বাঁধ হয়তো কোথাও ভেঙ্গে গেছে।
স্থানীয়রা যখন নিজেরাই এগিয়ে আসে কাজ করতে তখন তারা বস্তা ও বালুর অভাব অনুভব করে।দায়িত্বরত সংস্থা যদি সময় মতো এইটুকু সহযোগিতাও করে তবে স্থানীয়রাই রক্ষা করতে পারে এই বাঁধ। বর্ষার শুরুতেই যদি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বস্তা ও বালি মজুদ রাখা হয় তাহলেও অনেক কাজে দিবে বলে আমার বিশ্বাস।
এবারের বন্যায় খেয়াল করার মতো একটি বিষয় হলো – তারাকান্দি থেকে গাড়াবাড়ি অংশটুকু ঝুঁকি মুক্ত ছিলো। অথচ ২০১৭ সালে এই অংশটুকু ছিলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।এবার ঝুঁকিমুক্ত থাকার অন্যতম কারণ হলো ।বন্যার পরে গতবছর এই অংশের ব্যাপক সংস্কার করা হয়েছে।অপরদিকে গাড়াবাড়ি থেকে ভূঞাপুর অংশ তাড়াই বাঁধের কারেণে নিরাপদ ছিলো।১৭ জুলাই তাড়াই বাঁধ ভাঙ্গার ফলে ১৮ তারিখেই টেপিবাড়ি অংশে মূল বাঁধটি ভেঙ্গে যায়।
১৭ তারিখ রাত থেকেই তাড়াইসহ কয়েকগ্রামের মানুষ ৭/৮ ফিট পানির নীচে তলিয়ে যায়। রাত্রেই জীবন ও গবাদিপশু নিয়ে কোন রকম ভাবে তারা বাঁধের উপর এসে আশ্রয় নেয়।আশ্রয়ের সাময়িক সমাধান হলেও খাদ্যের সংকট দেখা দেয় প্রকট ভাবে। এই অবস্থায় আমরা সিধান্ত নেই অন্তত একটি গ্রামের জন্য আমরা একটা কিছু করবোই ।
ফেইসবুকে কিছু বন্ধুর সাহস পেয়ে ১৯ তারিখে অর্জুনা গ্রামের পানিবন্ধী ৮০টি পরিবারের মধ্যে আমরা শুকনো খাবার বিতরণ করি।ঐ দিনই আমরা সিধান্ত নেই তাড়াই গ্রামে একটা লঙ্গরখানা খোলা হবে।
২০-২৩ তারিখ পর্যন্ত প্রতিদিন প্রায় হাজারের অধিক লোকজনকে আমরা রান্না করা খাবার পরিবেশন করি।এলাকার যুবসমাজ এই কাজে যেভাবে এগিয়ে আসে তা অতুলনীয়।মূলত তাদের কারণেই এরকম একটি কষ্টসাধ্য কাজ সুশৃঙ্খলভাবে করা সম্ভব হয়েছে।
আর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করি সেইসব ফেইসবুক বন্ধুদের যারা অর্থ সহযোগিতা করে আমাদের সাহস যুগিয়েছেন। শুন্য হাতেই শুরু করেছিলাম এই কাজ নাসির ভাই আর ইশিকা ভাবীর সাহসে এই কাজে নেমে পড়ি। তারপর যেভাবে আপনারা পাশে দাঁড়িয়েছেন তা বর্ণনাতীত।
২২ তারিখ থেকে পানি কমতে শুরু করলে আমরা ২৩ তারিখে আমরা লঙ্গরখানা বন্ধ করে দেই। কিন্তু আমাদের কাছে কিছু টাকা বাড়তি থাকায় পরে পানিবন্ধী বিভিন্নগ্রামে আমরা শুকনো খাবার বিতরণ করি।
আমরা এখানে অবশ্যই উল্লেখ কতে চাই যে কোন সরকারি সংস্থা ও এনজিওর আগেই গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন তাঁদের পাশে দাঁড়াতে পেরেছিলো ।আর এটা সম্ভব হয়েছিলো কারণ আমরা বিশ্বাস করি -আমাদের সমস্যা আমরাই সমাধান করবো।

আমরা অবাক হয়েছিলাম প্রশাসন, জনপ্রতিনিধীদের ভূমিকায়। তিনদিনব্যাপি আমাদের কার্যক্রম চলাকালীন সময়ে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধি কেউ আমাদের সাথে দেখা না করলেও ৩ দিন পর হঠাৎ ইউওনোর ফোন আসে- প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া লঙ্গরখানা খোলা ঠিক হয়নি। এরপর এই ধারণের কার্যক্রম চালালে অবশ্যই প্রশাসনের পূর্বানুমতি নিতে হবে। অপরদিকে চেয়ারম্যান সাব স্থানীয় মেম্বার সাবকে ফোন দিয়েছিলেন কার হুকুমে আমরা এটা করছি? সে জানে কি না  ইত্যাদি ইত্যাদি। স্থানীয় কিছু হাইব্রিড লীগ প্রচার করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্যই নাকি আমাদের এই আয়োজন। একদিন হয়তো সময়ই এইসব প্রশ্নের উত্তর দিবে । আমরা তার অপেক্ষায় রইলাম।

আমরা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি সেইসব বন্ধুদের যারা আমাদের পাশে ছিলেন।
১. Md Nasir Uddin Howlader ৫০০০
২. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৩০০০
৩. হিমাংশু দাদা ২৬০০
৪. মুক্তার ভাই ৩০০
৫. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ২০০
৬. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৫০০০
৭. জুয়েল ভাই ৫০০
৮. মিঠু ২০০
৯. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৩০০০
১০. যুঁথী ভুঁইয়া ২০০০
১১. শশাঙ্ক দা ১০০০
১২. স্বজন ভাই ১০০০
১৩. মাসুম কাকা ২০০০
১৪. শাহজাহান সাজু ভাই ২০০০
১৫.জামির হোসেন ভাই ২০০০
১৬. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ২০০০
১৭. মাহবুব ভাই ৫০০
১৮. বৃষ্টি ২০০
১৯. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৫০০
২০. রোকেয়া আপা ১০০০
২১. হুমায়ুন মামা ১০০০
২২. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ২০০০
২৩. মনির মমতাজ ১০০০
২৪ সাবু ভাই ৫০০
২৫.হামরা রংপুরে ছাওয়া ফেসবুক গ্রুপ ১১২০০৳
26. faruk ahammed ১০০০০
২৭. রাজন ১০০০
২৮. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৩০০
২৯. রুবেল খান ৫০০
৩০. জনি ভাই ২০০০
৩১. শাওন ভাই ৫০০
৩২. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৫০০
৩৩. মাছুদ ভাই ১২,০০০
৩৪. নীলুফার আপা ৩০০০
৩৫. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৫০
৩৬. কেকা আপা ১০০০
৩৭. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ২০০০
৩৮. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ১৫০০
৩৯. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৯০০
৪০. সেতু রাইসুল ইসলাম ৩৩০০
৪১. রাশিদা সুলতানা আপা ১০০০০
৪২.Habitat Development Trust ১০০০০
43. অপু ও তার বন্ধুরা ৬০০০
৪৪. রাসেল ভাই ২০০০
৪৫. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৫০০০
৪৫. রব্বানী ও তাঁর বন্ধুরা ১২৫০০
মোট টাকা ১,৩৩,৬৫০/=


লঙ্গরখানা বাবদ খরচ (৩দিন)
চাল : ১৫ মণ ১৬৮০০
ডাল : ৩০ কেজি ১৫০০টাকা
ডিম : ১০০০ পিস =৭০০০ টাকা
মুরগীর মাংশ : ১২৫ কেজি= ১২০৭০ টাকা
আলু : ১৫০কেজি ৩৪৫০টাকা
তৈল : ২৭৫০ টাকা
লাকডি: ৩৭০০ টাকা
মসলা : ৭৭১০টাকা
বাবুর্চি : ৯০০০ টাকা
ডেকেরেটর : ৮০০০ টাকা
ব্যানার : ১২০০
নৌকা : ২৫০০
অন্যান্য : ১০০০
লঙ্গরখানার মোট ব্যায় : ৭৬৬৮০ টাকা

চিড়া : ১৭ মন = ১৯৮২৫/=
গুড় : ১৪ মণ = ২২১৭৫/=
যাতায়াত + পলি + নৌকা ভাড়া ও অন্যান্য: =১৪,৯৭০/=
মোট ব্যায়= ১,৩৩,৬৮০/=


মোট টাকা ১,৩৩,৬৫০/=
মোট ব্যায় =১,৩৩,৬৫০/=

Facebook Twitter LinkedIn Email

আপনার মতামত লিখুন :