ব্রহ্মপুত্র : বাংলাদেশের লাইফ লাইন

আমার কাছে বাংলাদেশের সত্যিকারের লাইফ লাইন মনে হয় ব্রহ্মপুত্র চ্যানেলটিকে। মূলত বাংলাদেশ নামের ব-দ্বীপটা গড়েই উঠেছে এই চ্যানেলের সেডিমেন্টশন দিয়ে। অথচ আমরা এর সাথে প্রতিনিয়ত করছি নানান রকম অবিচার।

১৯৬৫ সালের যুদ্ধের আগেও এই চ্যানেলটি কলকাতা ও আসামের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতো । ইদানিং শুনতে পাচ্ছি এটা আবার চালু হচ্ছে। একটু ইচ্ছে করলেই এবং যত্ন নিলেই নেপাল, ভুটান এবং ভারতের ৭ বোন এই চ্যানেল ব্যাবহার করে তাদের ল্যান্ড লকড অভিশাপটা ঘুচাতে পারে কিছুটা। একই সাথে বাংলাদেশও কুড়িগ্রাম এলাকায় শিল্পাঞ্চল নির্মান করে পিছিয়ে পড়া এই জনপদকে গড়ে তুলতে পারে একটা মডেল জেলা হিসেবে। রপ্তানী আয় যেমন বাড়বে একই সাথে বাড়বে রাজস্ব আয়। আঞ্চলিক দেনদরবারে বাংলাদেশ নিতে পারে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা ।

এই চ্যানেলের বিস্তৃর্ণ যে উর্বর ভূমি রুয়েছে তা সঠিক ভাবে আবাদ করলে বাংলাদেশ নিজের খাদ্য চাহিদা মিটিয়েও বাইরে রপ্তানী করতে পারবে। ব্রহ্মপুত্র বেণুণি প্রকৃতির নদী হওয়ার ফলে এর বুকে জেগে উঠেছে অসংখ্য চর। এই চরের জমিগুলো যেহেতু প্রতি বছর প্লাবিত হয় তাই থাকে ব্যাপক উর্বর। ফলে সার ও কীটনাশক ছাড়াই এখানে ফলানো যেতে পারে ফসল। বিচিত্র প্রজাতির নানা ফসল ফলিয়ে থাকে এই চরের কর্মঠ, পরিশ্রমী সাহসীমানুষগুলো। হাজার বছরের ঐতিহ্যগত জ্ঞান দিয়েই তারা আবাদ করে আসছে এই জমিকে। তাদেরকে যদি আধুনিক কৃষিতে দক্ষ করে তুলা যায় তাহলে বিশাল জনসম্পদে পরিণত হবে এই জনগোষ্ঠি।

এই চ্যানেলের আরেকটি সম্পদ হলো এর জল।অথচ কী দূর্ভাগ্য এই লক্ষ লক্ষ কিউসেক মিঠা পানি সম্পূর্ণ অব্যবহ্রত অবস্থায় চলে যাচ্ছে সমুদ্রে। ভূ-গর্বস্থ পানির উপর যে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে তার অনেকটাই হ্রাস করা যায় এই জল ব্যবহার করে। কিন্তু হায় আমরা তার কোন উদ্যেগ দেখছি না। আমরা তিস্তার জল নিয়ে যে পরিমান মাতন করছি তারচেয়ে যদি েএই জলের সদব্যবহারের দিকে নজর দিতাম তাহলে এতো দিনে খাদ্য রপ্তানীর দেশে পরিণত হতো বাংলাদেশ।

ইদানিং চাঁদপুর চ্যানেলে ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করায় ইলিশ মাছের বিচরণ ভূমি এখন আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত।ফলে গত দুই বছর ধরে ভারত সীমান্ত পর্যন্ত ইলিশের অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে ইলিশ অধাধে চলে যাচ্ছে ভারতে। এবং সেখানকার জেলেরা মহাসুখে ইলশ নিধন করছে। এখন ভেবে দেখার সময় হয়েছে ভারত যদি আমাদের মতো একই পদক্ষেপ না নেয় তাহলে আরিচা থেকে নারায়নপুর পর্যন্ত এই বিধিনিষেধ শিথিল করা হোক। এতে বিশাল পরিমাণ মাছ আহরণ করা যাবে। তাছাড়াও বর্ষার পরপরই পুরো ব্রহ্মপুত্র জুড়ে অসংখ্য নালার সৃষ্টি হয়। তাতে সারা বছর পানি থাকলেও স্রোত থাকে না। ফলে একেকটা নালা ছোট খাট হ্রদের মতো দেখায়। সেখানে যদি বৈজ্ঞানিক উপায়ে ভাসমান পদ্ধতিতে মাছ চাষ করা হয় তাহলে সেখানে ব্যাপক পারিমাণ মাছ উৎপাদন করা যাবে যা দেশের চাহিদা মিটিয়েও বিদেশে রপ্তানী করা যাবে।

এই চ্যানেলের আরেকটি উল্লেখযোগ্য সম্পদ হলো এর নয়নাভিরাম সৈন্দর্য্য। এর বুকে জেগে উঠা হাজার হাজার চর হতে পারে পর্যটকদের তীর্থভূমি। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো পাহাড় ও সমুদ্রকে যে ভাবে প্রমোট করা হয় তাতে মনে হয় বাংলাদেশ পাহাড় আর সমুদ্রের দেশ। কিন্তু হায় তারা ভুলে যান যে বাংলাদেশ একটা নদীমাতৃক দেশ। এদেশের প্রাধান থেকে প্রধানওতম কবিরা যে ভাবে নদী বন্ধনা করেছেন পর্যটন বিকাশের কর্তা ব্যক্তিরা মনে হয় সে সব বেমালুম ভুলে আছেন। আমরা কী ভাবে ছিন্নপত্র কে ভুলে সাজেকের দিকে হাঁটলাম সেসব আমার মতো ছোটলোকদের মাথাতেই আসে না। সোনার তরীর মতো কাব্যের রসদ যুগিয়েছে যে নদী সেই আমরা কীভাবে দৈর্ঘতম সুমুদ্র সৈকতে গিয়ে হোচট খেলাম।
বিশ্বের অন্যতম বিনুনী এই নদীই আমাদের পরিচয়। এই নদীই হবে আমাদের আগামী দিনের লাইফ লাইন। এই সত্যটা আমরা যত তাড়াতাড়ি বুঝবো ততই আমাদের মঙ্গল।

বি:দ্র: যাহাদের মনে ক্ষত রহিয়াছে । তাহাদের জন্য টোটকা। যদি অল্পক্ষণ তাহারা এর জলে ও বাতাশে সিক্ত হোন তাহলে অল্পক্ষণের মধ্যেই সেই ব্যাথ উপশম হইবে। না হইলে আমার এই কথা ফেলত লওয়া হইবে।

Facebook Twitter LinkedIn Email

আপনার মতামত লিখুন :