কেরাম উৎসব

আমরা তখনো জগদল বিহারে। পুরোটা খনন করা হয়নি। শুনেছি এরকম আরো ১২টা বিহার এখনো মাটির নীচে । যেখানে বিহারগুলো আছে সেখানকার মাটি অনেক উচুঁ। ঘণ জঙ্গলে আবৃত।ঐ মাটি খনন করলেই বেরিয়ে আসবে হাজার বছর আগের সভ্যতা। আমরা যে বিহারটাতে দাঁড়িয়ে – তার এখানে সেখানে পড়ে আছে পাথরের স্তম্ভ। অমূল্য এই সম্পদগুলো পড়ে আছে অনাদর আর অবহেলায়। এখানকার একজন প্রহরী বললেন ৬ মাস আগে এখান থেকে একটি পাথর চুরি হয়ে গেছে। এই বিহার থেকেই ৫ কিমি দূরেই ভারত সীমান্ত। বাকী পাথরগুলি কেন চুরি হচ্ছে না সেই জন্য চোররা ধন্যবাদ পাবারই যোগ্য। অন্যান্য বিহারের খোজেঁ আমি যখন জঙ্গলের দিকে যাচ্ছিলাম দেখলাম ঝোপের আড়ালে একদল নেশাখোর তাশ পেটাচ্ছে। হায় হাজার বছর আগে এখান থেকে প্রায় ১০ হাজার বই তীব্বতী ভাঘায় অনুদিত হয়েছিল। এই বিহারেরই কোন একটা কক্ষে থাকতেন বৌদ্ধ ধর্ম সংস্কারক শুভকর।তিনি বলতেন বৌদ্ধ পুরোহিতের সামনে কেউ ত্রিসরণ গমন করলেই সে বৌদ্ধ হয়ে যাবে। এই বিহারের বিভিন্ন কক্ষে বসেই বিভূতিচন্দ্র, দানশীল, মোক্ষাকররা জ্ঞানের চর্চা করতেন। চীন জাপান মালয়, শ্যাম দেশ থেকে শত শত তুরুণ বিদ্যা অর্জনের জন্য যেখানে আসতেন সেই স্থান নিরব , নির্জন আর নেশাখোরদের নিরাপদ আবাসস্থল। মনটা খুব খারপ হয়ে গেল। আমাদের নাকি মিসকিনের জাত বলা হয়। এতো বড় সম্পদ থাকতেও যারা তার খোজঁ রাখে না তারা মিসকিন না তো কি? মাটি খুড়ঁলেই বেরিয়ে আসছে ইট। আর সেই ইট দিয়ে স্থানীয়রা বানাচ্ছে রান্নার ঘর কিংবা সৌচারগার। আর এখানে থাকতে ইচ্ছে হলো না । সঙ্গে আসা নওগাঁর বন্ধু রায়হান ভাই বললেন আজ কিন্তু কেরাম উৎসব । আদিবাসীদের বড় ধর্মীয় উৎসব। কিন্তু কোথায় হবে রায়হান ভাই বলতে পারলো না । হঠাৎ মনে হলো হাজী দানেশে পড়া গ্রাম পাঠাগার আন্দোলনকর্মী স্বপনের কথা। ওরা ওরাঁও । জয়পুরহাট বাড়ি। ও একটু খোজঁ খবর নিয়ে জানালো মহাদেবপুর আদিবাসীরা আজ রাতে ডাল পূজা করবে। ওখানে গৌর কুজুর নামে এক দাদা আছেন। ওনার ওখানে যেতে পারেন। জগদল বিহার থেকে আমরা ছুটলাম মহাদেবপুরের দিকে।রাত ৮ টার মধ্যে আমার পৌছেঁ গেলাম মহাদেবপুর।সেখান থেকে নাটশাল। এক পাড়ায় মাদলের শব্দ শুনে আমরা ডুকে পড়লাম। এখনো শুরু হয়নি। চলছে ক্যামেরার আলোকবাজি। এনজিওয়ালাদের পৌরহিত্য। গৌরদাকে ফোন দিলাম। বলল আমাদের পাড়ায় আসেন। সোজা রাস্তা ধরে বকাপুর। আমি আর রহমান ভাই ছুটলাম বকাপুরের দিকে। রাস্তায় শুনশান নিরবতা। দূরের পাড়া থেকে ভেসে আসছে মাদলের শব্দ। কয়েকটা কুকুরের চিৎকার। ভাদ্রের পূর্ণিমার চাঁদে আলোকিত হয়ে উঠছে পূর্বাকাশ ।পাশে ধানী জনি। রায়হান ভাই বলছেন – “সামনেই নাটশাল মাঠ। আগামীকাল এখানে সবপাড়ার কেরাম এসে যাবে। উৎসবে মজে যাবে সারা এলাকার মানুষ। আলফ্রেড সরেনকে হত্যার পর থেকেই এখানে কেরাম উৎসব খুব জমে উঠেছে- প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে। জোতদাররা আলফ্রেডকে হত্যা করেছিল। আলফ্রেডের অপরাধ ছিলো সে ভুমিধিকার চেয়েছিলো। ভূমিপুত্রদের ভুমির অধিকার চাওয়া যে পাপ তা আলফ্রেড ভুলে গিয়েছিলো ।তাই তাকে হত্যার মধ্য দিয়ে স্মরণ করিয়ে দিলেন জোতদার সিতেশ চন্দ্র ওরফে গদাই আর হাতেম। হত্যার ১৬ বছর পার হয়ে গেলেও তাদের কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারে নি স্বাধীন বাংলাদেশের আইন।এই হত্যার প্রতিবাদ জানাতেই মামুনুর রশিদ লিখেন তার বিখ্যাত নাটক রারাং। গল্প করতে করতে আমরা এসে যাই বকাপুরের ওরাঁও পাড়াতে। গৌরদার খোজঁ করতেই দেখি মাদল রেখে আমাদের সামনে এসে এক লোক দাড়ায় আমিই গৌর কুজুর। আমাদের নিযে বসতে দেন পাটিতে। উঠানের মধ্যিখানে করা হয়েছে পূজা মঞ্চ। দেখলাম একটা অচেনা বৃক্ষের ডাল পুতে রাখা হয়েছে।তারা বলেন – কেরাম বৃক্ষের ডাল। তাই এই উৎসবের নাম কেরাম উৎসব। অল্পবয়সী মেয়েরা সেটা ঘিরে রেখেছে। তাদের হাতে , খোঁপায় শাপলা ফুল। পাশে বসা এক পৌড় পুরোহিত। মন্ত্র পড়ছে। মন্ত্র পড়া শেষ হলো। মেয়েরা তাদের হাতে রাখা শাপলাফুল অপর্ণ করলেন ডালের গোড়ায়। তারপর তিনপাক ঘুড়লেন। গতকাল রাত থেকে তারা উপবাসী। এখন তারা কিছু খাবেন। এরপর শুরু হলো নৃত্য। মাদলের তালে তালে নৃত্য। সববয়সী ছেলে-মেযেরাই এই নৃত্যে অংশগ্রহণ করে থাকে। একপর্যায়ে বৌদি এসে আমাদের ডেকে নিয়ে গেলেন তার ঘরে। খেতে দিলেন মুড়ি আর তালের পিঠে।গল্প হয় বৌদির সাথে – বৌদি তুমিও কি উপবাসী থাকতা? হু , ছোট বেলায় করেছি। কি চাইতা কেরামের কাছে। একটু লজ্বা পেলেন। তারপর বললেন –“একটা ভালো ছেলে চেতাম”। আমরা আবার যোগ দেই অনুষ্ঠানে। মাদলের তাল তালে নৃত্য হচ্ছে। একই মুদ্রার নৃত্য। কিন্তু বিরক্ত লাগছে না। একজন প্রথমে গান গাচ্ছে আর সকলে মিলে তার দোহার দিচ্ছে। পূর্ণিমার আলোয় খলবল করছে আঙ্গিনা। মাদলের শব্দ আর তাদের নিজস্ব ভাষার সঙ্গীতে মনে হচ্ছে এটা পৃথিবীর বাইরের কোন জায়গা। এখানে কোন ব্রাহ্মণ নেই ।ফলে তাদের জাত যাওয়ার ভয় নেই। এখানে দূর্গা নেই, গণেশ নেই, কার্তিক নেই, সাকার , নিরাকার কোন ইশ্বর নেই। এখানে বৃক্ষের ডাল আছে। যে বৃক্ষ তাদের ছায়া দেয়, কাঠ দেয়, পাখিদের আশ্রয় দেয় সেই বৃক্ষের বন্দনা চলছে। গৌর কুজুরের মাদলের শব্দে যেন সারা ওরাঁও পাড়া জেগে উঠেছে।গৌরদার ভিতরে যেন তার পূর্বপুরুষেরা এসে ভর করেছে। প্রকৃতির সন্তান প্রকৃতির বন্দনায় মগ্ন। মাদলের শব্দে আর হাড়িয়ার রসে মেয়ে নাচছে, ছেলে নাচছে, গাছ নাচছে, উঠোন নাচঠে আমি নাচছি সকলের দেহে যেন নাচের তুফান উঠেছে।

Facebook Twitter LinkedIn Email

আপনার মতামত লিখুন :