এ অসুখ সারবে কবে?

2543_799451436865950_792684992402337526_n

কিছুদিন আগে একটি পাঠাগার উদ্বোধন করতে গিয়েছিলাম বালোবাড়ি। টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার এক প্রত্যান্ত গ্রাম বালোবাড়ি।প্রায় তিন হাজার ভোটার নিয়ে দক্ষিণ নারুচি ও বালোবাড়ি নিয়ে এক ওয়ার্ড।এই নারুচি গ্রামেই জন্ম হয়েছে মহান স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অর্থসচিব বর্তমান সংসদ সদস্য খন্দকার আসাদুজ্জামান।নিজের গ্রামেই তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন স্কুল, কলেজ, স্টেডিয়াম, পার্ক অনেক কিছু। অথচ তার নিজের শোয়ার ঘর থেকে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে বালোবাড়ি গ্রামে নেই কোন পাকা রাস্তা। গত ১০ বছরে নাকি কোন মাটি পড়ে নি বালোবাড়ি গ্রামের কোন রাস্তায়।কেন এই বৈষম্য ? প্রশ্ন করেছিলাম ঐ গ্রামের মানুষদের। তাদের উত্তর – “আমরা ভিন্ন রাজনৈতিক দল করি, তাই এমপি সাব আমাদের দেখতে পারেন না।”।

ইউপি নির্বাচনের হাওয়া লেগেছে আমাদের গ্রামে।তিনজন প্রার্থী নির্বাচন করছে আমাদের ইউনিয়নে।আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও স্বতন্ত্র থেকে একজন করে।আমাদের ইউনিয়ন যমুনা নদী দ্বার দুই ভাগে ভিভক্ত। ফলে ভোটাররাও দুই ভাগে বিভক্ত। পশ্চিমপাড়ের ভোটার আর পূর্বপারের ভোটার। পশ্চিম পাড়ে দুইজন আর পূর্বপাড়ে একজন। পূর্বপাড়ের প্রার্থী আওয়ামী সমর্থক হলেও দলীয় সমর্থন না পেয়ে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করছেন।পাড়ের ঐক্যের স্বার্থে সাধারণ ভোটাররা তার দিকেই আছেন বেশি।তাদের এক কথা চোর হোক, ডাকাত হোক, বদ হোক  ও আমাগো পাড়ের পোলা। ওরে ছাড়া আর কাউরে ভোট দেয়া যাবো না।  এখন যারা তার নির্বাচন করছেন না বা দলীয় নির্বাচন করতে চাচ্ছেন তাদেরকে বলা হচ্ছে তারা রাজাকার, তারা মির্জাফর। প্রশ্ন হলো যদি এই প্রার্থী দলীয় প্রতীক পেতন যার জন্য তিনি চেষ্টাও করেছিলেন তখন তিনি কি এই কথাগুলো বলতেন?

এই যে সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী ক্ষমতাবান খন্দকার সাহেব আর আমার গ্রামের সাধারণ ভোটারের  মনোজগৎ কিন্তু একই।তারা প্রত্যেকই একটা সাধারণ অসুখ দারা আক্রান্ত। সেই অসুখটা হলো জাতীয়তাবাদ।এটা নানা জায়গায় নানা রকম ভাবে ব্যবহৃত হয়। কোথাও সেটা জাতীর নামে , কোথাও ভাষার নামে, আঞ্চলিকতার নামে, লিঙ্গের নামে, ধর্মের নামে।সমতলের কেউ রেপ হলে আমরা যেমন প্রতিবাদ মুখর হই পাহাড়ের কেউ রেপ হলে আমরা ততটাই নিরব থাকি।আমার ধর্মের কেউ পৃথিবীর কোন জায়গায় আক্রন্ত হলে আমি যে রকম ভাবে উত্তেজিত হয়ে যাই একইভাবে আমার দেশে ভিন্ন ধর্মের কেউ আমার ধর্মের লোক দ্বারা আক্রান্ত হলে আমরা নির্জীব হয়ে যাই ।

এই অসুখের কথা রবীন্দ্রনাথ খুব ভালো করেই জানতেন।স্বদেশী আন্দোলনের তীব্র জোয়ারে বাংলার হাজার বছরের নিস্তরঙ্গ পল্লী যখন জেগে উঠলো চরকার আওয়াজে।ইংরেজদের সমকক্ষ না হয়েই যখন ইংরেজী পণ্য বর্জণের ঘোষণা আসলো দিকে দিকে তখন রবীন্দ্রনাথ লিখলেন ‘ঘরে বাইরে’।তিনি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন এই তীব্র স্বদেশীবাদের বিপদটা কোথায়।জানি না সেদিন তার সময় তাকে কিভাবে গ্রহণ করেছিলো।কিন্তু তিনি চেষ্টা করেছিলেন এই অসুখের একটা দাওয়াই বের করতে।গোরা উপন্যাসের ভিতর দিয়ে তিনি সেটা করেছিলেন।প্রচণ্ড হিন্দুত্ববাদী, ভারতের পুনর্জাগরণের জন্য যিনি নিজের জীবনকে উৎসর্গ করতে চাচ্ছেন পূর্বপুরুষের পাপকে যিনি একাই স্খলন করতে চাচ্ছেন সেই গোরা যখন জানতে পারলো তিনি হিন্দুতো ননই এই ভূভারতেরও সে কেউ নন।তার এতোদিনের বিশ্বাস , এতোদিনের সংস্কার একটি কথাতেই মহূর্তের মধ্যেই কর্পূরের মতো উবে গেল।সে এদের কেউ নন।

মহাত্মা লালন ফকিরও ধরতে পেরেছিলেন এই অসুখের কথা।তাই ছেউড়িয়ার পাড় থেকে একতারার শব্দের সাথে কানে সেই অমর বাণী-

“এমন মানব সমাজ কবে গো সৃজন হবে

যে দিন হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান জাতি গোত্র নাহি রবে।”

 

10441234_799451320199295_5681349750602311236_n

Facebook Twitter LinkedIn Email

আপনার মতামত লিখুন :