অর্জুনা বইমেলা

দেখতে দেখতে ৯ বছর হয়ে গেল। সেই ২০০৬ সাল থেকে শুরু করেছিলাম। আজকে ছোট ভাইয়েরা করছে।

অর্জুনা অন্বেষা পাঠাগারের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী হিসেবে এই বইমেলার আয়োজন করে থাকে। প্রতি বছর ২১.২২,২৩ ফেব্রুয়ারি আয়োজন করা হয় এই বইমেলার।

আজকের এই বইমেলা শুধু পাঠাগারের সদস্যদের মেলা না। পুরো কয়েকগ্রামের একটা প্রাণের মেলায় পরিণত হয়েছে। শুধু এই মেলার জন্যই গ্রামের ছেলেরা তাঁদের ছুটি সংরক্ষণ করে রাখে। গ্রামের মেয়েরা বাপের বাড়ি আসে এই সময়ই। শুধু লেগে থাকলে কিভাবে একটা সামান্য অনুষ্ঠান একটা সার্জনীন অনুষ্ঠান হতে পারে এই বইমেলা তার প্রমাণ।

জানুয়ারি মাস থেকেই শুরু হয়ে যায় মেলার কাজ। প্রথম দিকে ৫/৬ টা স্টল দিয়ে মেলা শুরু হলেও এখন সেটা ২০/২৫ এ উঠেছে। যারা পাঠাগারের সদস্য না কিন্তু বইয়ের দোকান দেন তাদের উৎসাহটা দেখার মতো। কি পরিশ্রমটাই না করেন এই কয়টা দিন। কার্ড করা, পোস্টার করা, মাইকিং করা, অতিথীদের দাওয়াত দেয়া , শিল্পী ঠিক কার, লটারি বিক্রি করা( বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা ১০ টাকা মূল্যমানের একটা লটারি বিক্রি করে, এটাই টাকা আয়ের তাদের মূল উৎস) এই কয়দিন তারা ঠিকঠাক মতো ঘুমাতেও পারে না।

বইমেলাটাকে এই পর্যায়ে আনতে অনেক কাঠ খড় পুড়াতে হয়েছে। এই ধরণের কোন ধারনাই ছিলো না তাদের। তারপর ছিলো গ্রামের প্রতিষ্ঠিত লোকদের বাড়াবাড়ি রকমের বিরোধিতা। রাজনৈতিক রক্তচক্ষু তো ছিলোই । প্রতি বছর মেলা শেষে দেখা গেছে পাঠাগার ২০/৩০ হাজার টাকা ঋণে পরে গেছে।

এইবারও ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই তারা অনুষ্ঠান করতে নেমেছে। এতো ঋণ, এতো ঝামেলা স্বত্বেও কিভাবে এই পাঠাগারটা এতোদিন টিকে থাকলো সেটা এখন মাঝে মাঝে আমাকে ভাবায়। টিকে আছে মানে বেস ভালোভাবেই টিকে আছে। আর এর টিকে থাকার প্রাধান কারণটাই হলো এর গণতন্ত্র। প্রতি বছর এর নেতৃত্ব পরিবর্তন হয়েছে। নতুন নতুন সভাপতি এসেছেন। সবাই তাকে সহযোগিতা করেছেন।

তাদের মধ্যে মতবিরোধ যে হতো না তা নয়, বেশ কঠিন ভাবেই হয়। প্রতিটা সদস্যদের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হয়। তর্ক-বিতর্ক যে কম হয় তাও বলা যাবে না। কিন্তু যখন একটা সিধান্ত নেয়া হয় তখন সবাই সেটা বাস্তবায়ন করার জন্য উঠে-পড়ে লেগে যায়। মাঝে মাঝে দেখা গেছে একটা অনুষ্ঠান করতে গিয়ে নিজের বাপের সাথেও হযতো ঝামেলায় জাড়াতে হয়েছে।

এই ৯ বছরে পাঠাগারে তাদের অর্জন নেহায়েত কম নয়। পাঠাগারের জন্য একটা জমি কেনা হয়েছে। বণ্যা, খরা , সিডর নানা প্রকৃতিক দূর্যাগে তারা মানুষের পাশে দাড়িয়েছে। ২ টা স্টিলের বুকসেলফ সহ ৩০০০ বই রয়েছে পাঠাগারে। বলতে গেলে তাদের উদ্যেই গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি কলেজ। গ্রাম পাঠাগারের চিন্তাটাও এসেছিলো এই পাঠাগারের কাজ করতে গিয়ে। সেই হিসেবে এই পাঠাগারকে গ্রাম পাঠাগার আন্দোলনের আতুরঘরও বলা যায়।

অর্জনের পাশাপাশি আছে ব্যার্থতাও। বই পড়ায় সদস্যদের চরম রকমের অনাগ্রহ। বেশিরভাগ সদস্যদের একাডেমিক পড়ালেখায় আগ্রহ খুব কম। সামন্য বিষয় নিয়ে কিছু সদস্যের চলে যাওয়াটা ছিলো খুব কষ্টকর। অনেক সময় দেখা যায় ভিন্নমত কে অনেকেই সহ্য করতে পারে না। মতের অমিলকে অনেকেই তার বিরোধিতা মনে করেন। অপরকে হেয় করার মানসিকতাও দেখা যায় কারো কারো মধ্যে। যাই হোক এসব কমবেশি বাঙ্গালী হিসেবে আমাদের সকলের মধ্যেই আছে।

এইবারো পুরোদমে শুরু হয়ে গেছে মেলার কাজ। বাড়ি বাড়ি লটারি বিক্রি করতে যাচ্ছে সদস্যরা, এবার নিজেরাই নাটক লিখে নাটক করছে, প্রতিদিন সন্ধ্যায় মহড়া হচ্ছে তার। নাটকের প্রয়োজনে নিজেরা কাঠ-বাঁশ দিয়ে বানিয়েছে শহীদ মিনার।িআরো যে কতো কাজ করতে হচ্ছে তার হিসেব নেই। এইবার বই মেরায় ৬টি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হবে।

সেদিন হয়তো বেশি দূরে নয়, যে দিন পাঠাগারের সদস্যরা নাটক, উপন্যাস , ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞানসহ সাহিত্যের নানা শাখার বই লিখবে।এই মেলা দেখতে আসবে দেশ-বিদেশের নানা বইপ্রেমিক মানুষ, লেখক, সাহিত্যিক।

সকলের নিমন্ত্রণ রইলো – অর্জুনা বইমেলায়।

Facebook Twitter LinkedIn Email

আপনার মতামত লিখুন :