সে আলো ছড়িয়ে পড়ুক (প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদন)

120 জন পড়েছে

এক মিনিটের বেশি নয়

প্রথম আলো লিংক : সে আলো ছড়িয়ে পড়ুক
লেখক: হাবিবুল্লাহ সিদ্দিক
পড়াশোনার পাট চুকিয়ে কেউ করেন চাকরি, কেউ ব্যবসা, কেউবা বেছে নেন অন্য কোনো পেশা। আবদুস ছাত্তার খান পড়াশোনা শেষ করে শুরু করলেন আন্দোলন। এই আন্দোলন গ্রামে গ্রামে পাঠাগার গড়ে তোলার। জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার।

অর্জুনা অন্বেষা পাঠাগারে আলোর ফেরিওয়ালা ছাত্তার খান। ছবি: কামনাশীষ শেখর

আবদুস ছাত্তার খান পড়াশোনা করেছেন ঢাকা কলেজে, উদ্ভিদবিদ্যায়। পড়াশোনার পাট চুকিয়ে একজন তরুণ কী করেন? চাকরি, ব্যবসা না হয় বেছে নেন অন্য কোনো পেশা। আবদুস ছাত্তার খান এসবের কিছুই করেন না। তিনি করেন ‘আন্দোলন’—গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন। আন্দোলন হবে রাজপথে। কিন্তু আবদুস ছাত্তার খানের আন্দোলন হয় গ্রামে, নীরবে-নিভৃতে। বিভিন্ন গ্রামে পাঠাগার করার স্বপ্ন তৈরি করে দিয়ে সেটি বাস্তবায়ন করার পথ বাতলে দেওয়াই তাঁর আন্দোলনের মূল কথা। এই আন্দোলনের ফসল হিসেবে এরই মধ্যে সারা দেশে এখন পর্যন্ত গড়ে তুলেছেন ৩৪টি পাঠাগার। তাঁর এই উদ্যোগ ও স্বপ্ন সঞ্চারিত হয়েছে অসংখ্য তরুণের মধ্যেও। টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার অর্জুনা গ্রামের এই তরুণের পাঠাগার গড়ার স্বপ্ন এরই মধ্যে সাড়া জাগিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

নিজ গ্রাম থেকে শুরু
২০০৬ সাল। টগবগে যুবক ছাত্তার খান। পড়াশোনার পাশাপাশি চিন্তা করেন কিছু একটা করার। একসময় গ্রামে অন্বেষা পাঠাগার নামে একটি পাঠাগারের গল্প শুনেছেন। কিন্তু বড় হয়ে সেটা আর চোখে দেখেননি। শোনা গল্পটা আবার সত্যি করার স্বপ্ন দেখেন তিনি। তাঁর স্বপ্নের সারথি হন গ্রামের আরও কয়েকজন তরুণ। কিন্তু সমস্যা হলো, পাঠাগার হলেই সবাই হুড়মুড় করে বই পড়তে আসবে, এমন তো না-ও হতে পারে। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ছাত্তার জড়িয়ে পড়েন আরও কিছু কাজে। বলছিলেন সে বিষয়ে, ‘বই পড়ার পাশাপাশি আমরা নানা ধরনের সামাজিক কাজে নিজেদের যুক্ত করি। কারণ, আমাদের ধারণা ছিল শুধু পাঠাগার হলে একসময় সবাই আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। তাই আমরা পাঠাগার থেকে কখনো বইমেলার আয়োজন করি, কখনো গ্রামের পাশে বন্যানিয়ন্ত্রণের বাঁধ সংস্কার করি। রাস্তা মেরামত করি। কখনো যাত্রীছাউনি তৈরি করে দিই। বিজ্ঞান মেলার আয়োজন করি। বন্যাদুর্গত ব্যক্তিদের সহযোগিতা করি।’
ছাত্তার খানের কাজে শুরু থেকেই গ্রামের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ বেশ উত্সাহ দেন। বাঁশ, বেত, রশি থেকে শুরু করে নানা জিনিসপত্র দিয়ে সহযোগিতা করেন। তাঁদের সহযোগিতায় পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার অর্জুনা অন্বেষা পাঠাগার। গ্রাম ও হারিয়ে যাওয়া পাঠাগারটি এক জায়গায় করেই নামকরণ করেন ছাত্তার।

গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন এগিয়ে নিতে এমন ​বৈঠক হয় নিয়মিত গ্রাম থেকে গ্রামে

২০০৭ সালে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সিডর আঘাত হানে দক্ষিণ অঞ্চলে। কিছু একটা করার তাগিদে নড়েচড়ে বসেন পাঠাগারের সদস্যরা। গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাঁরা কিছু টাকা আর চাল তোলেন। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় সেগুলো পাঠানো নিয়ে। টাঙ্গাইল থেকে দক্ষিণ অঞ্চলে সেসব নিয়ে যাওয়া কঠিনই বটে।
পরে উপজেলা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে সরকারি ত্রাণ তহবিলে জমা দেওয়া হয় টাকা আর চাল। কিন্তু যথাযথ মানুষের কাছে পৌঁছাবে কি না, সেটা নিয়ে খানিকটা সন্দেহ থেকে যায়। সন্দেহ থেকেই চিন্তাটা আসে ছাত্তার খানের মনে। যদি ওই অঞ্চলে এই পাঠাগারের মতো কোনো সংগঠন থাকত, তাহলে এটা খুব সহজেই পৌঁছে দেওয়া যেত।
ঠিক এই চিন্তা নিয়েই ছাত্তার খান আলাপ করেন র্যামন পাবলিশার্সের স্বত্বাধিকারী সৈয়দ রহমতউল্লাহর সঙ্গে। বাকিটুকু শুনুন ছাত্তার খানের মুখে, ‘রাজন ভাই (সৈয়দ রহমতউল্লাহ) আমাকে আশ্বাস দেন, যত বই লাগে তিনি দেবেন। তাঁর কথায় ভরসা রেখে আমরা বিভিন্ন জায়গায় পাঠাগার স্থাপনের কাজ শুরু করি। শুরুতে কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, চাঁদপুর, নাটোর, বদলগাছি, মধুপুর, সখীপুরসহ বেশ কিছু জায়গা থেকে সাড়া মেলে। ওই অঞ্চলের আমাদের বন্ধুরা একত্র হয়ে শুরু করেন কাজ। আমি কৃতজ্ঞ তাঁদের প্রতি, যাঁরা আমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছেন।’
এখানেই শেষ নয়, বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে ওঠা পাঠাগারগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ করেন ছাত্তার খান। তারপর একসঙ্গে ডাক দেন আন্দোলনের। যার নাম ‘গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন’।

আন্দোলনে কী হয়?
ছাত্তার খানের কাজের ধরনটা এমন, তিনি আগে নির্দিষ্ট গ্রামের আগ্রহী তরুণদের সঙ্গে আলাপ করেন। তারপর তাঁদের নিয়ে গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে বসেন। পাঠাগারের প্রয়োজনীয়তা এবং একটি পাঠাগার বই পড়ার বাইরেও যে অনেক কাজ করতে পারে, সেটি নিয়ে আলাপ করেন।
এরপরই গ্রামবাসীর কাছ থেকে জমি, অর্থ এবং অন্যান্য জিনিসপত্র নিয়ে শুরু করেন ঘর নির্মাণের কাজ। গ্রামের তরুণদের কাছ থেকে এবং ফেসবুকের মাধ্যমে সংগ্রহ করেন বই। যাত্রা শুরু করে একটি পাঠাগার।
তবে কথা প্রসঙ্গে সতর্ক করেন ছাত্তার খান, ‘নামের মাঝে “পাঠাগার” শব্দটি থাকলেও, গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন কোনোভাবেই পাঠক তৈরির আন্দোলন নয়। পাঠক তৈরি হলে সেটা আমাদের বাড়তি পাওনা। আমাদের আসল কাজ প্রথমে গ্রামের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা। তারপর সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুততার সঙ্গে সমস্যার সমাধান করা। আর বই পড়ার ব্যাপারটি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া।’
ওই স্বল্প এবং সংঘবদ্ধ মানুষগুলোর নিরন্তর প্রচেষ্টাকেই তাঁরা বলেছেন, ‘গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন’। মূল কথা হলো পাঠাগারগুলো গড়ে ওঠে স্বাধীন ও স্বতন্ত্রভাবে। এলাকার প্রয়োজন, চাহিদা, ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করে স্থানীয় বাসিন্দারাই সিদ্ধান্ত নেন, কী হবে তাঁদের কর্মপরিকল্পনা।

প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্বপ্নের কলেজ, এবার এগিয়ে নেওয়ার পালাএবার হবে কলেজ

ছাত্তার খানের আরেকটি স্বপ্নের নাম হাজী ইসমাইল খাঁ কলেজ। সম্প্রতি অর্জুনা গ্রামের তরুণেরা মিলে নিয়েছেন এ উদ্যোগ। গ্রামের তরুণেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা তুলেছেন। বাঁশ-কাঠ তুলেছেন। আর জমি দিয়েছেন হাজী ইসমাইল খাঁর নাতি-নাতনিরা। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন আনোয়ারা বাসিত মেমোরিয়াল ট্রাস্ট, পড়শি ফাউন্ডেশন, হোপ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বন্ধুদের কাছ থেকে পেয়ে যান কিছু আর্থিক সহযোগিতা। নিজেরাই শুরু করেন মাটি কাটা, ঘর নির্মাণ থেকে যাবতীয় কাজ। শুরু হয় নতুন স্বপ্নের বীজ বোনা।
গত বছর কলেজটির উদ্বোধন হয়ে গেছে। নিয়োগ হয়েছে শিক্ষকও। এখন ভর্তি চলছে শিক্ষার্থীদের। ছাত্তার খান কলেজ নিয়ে একটি কথাই বললেন, ‘আমাদের ইচ্ছে কলেজটি হবে শান্তিনিকেতনের আদলে। এ কারণে শান্তিনিকেতন চালু হওয়ার দিন ২২ ডিসেম্বর আমরা কলেজটির উদ্বোধন করেছি। সেই সঙ্গে পড়াশোনার সময়টুকু ছাড়া বাকি সময় কলেজটি গ্রাম উন্নয়নের কার্যক্রম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এতে গ্রামের মানুষের সঙ্গে কলেজেরও একটা সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে।’

অন্বেষা পাঠাগারে এক বেলা
কামনাশীষ শেখর, টাঙ্গাইল
অর্জুনা অন্বেষা পাঠাগার। অর্জুনা গ্রামের নতুন প্রজন্মের জীবনাচরণই যেন পাল্টে দিয়েছে। কয়েক বছর আগেও দেখা যেত উঠতি বয়সের ছেলেরা এখানে-সেখানে আড্ডা দিয়ে সময় কাটাত। এখন অনেক তরুণই যান পাঠাগারে।
২ সেপ্টেম্বর ভূঞাপুরে যমুনা নদীর তীরে প্রত্যন্ত গ্রাম অর্জুনায় গিয়ে দেখা যায়, এ পাঠাগারের উদ্যোক্তারা প্রতিষ্ঠা করেছেন কলেজটি। সেই কলেজের টিনের চালা দেওয়া ঘরে প্রায় ২০০ বর্গফুট জায়গার এক ঘরে চলছে পাঠাগারের কার্যক্রম। ঘরে আলমারিতে থরে থরে সাজানো বই। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, ভ্রমণকাহিিন, জীবনী—সব ধরনের বই রয়েছে। পাঠাগারে টাঙানো আছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কবি শামসুর রাহমান ও হুমায়ুন আজাদের ছবি। কথা হয় গোপালপুর কলেজের স্নাতক (সম্মান) শ্রেণির ছাত্র মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘গ্রামে বসে পছন্দের বই পড়তে পারছি, এটি সম্ভব হয়েছে এই পাঠাগারের জন্য।’
ভূঞাপুর ইব্রাহীম খাঁ কলেজের ছাত্র হাসান খান বলেন, এই পাঠাগারকে কেন্দ্র করে শুধু বই পড়া নয়—একটি মুক্ত আড্ডার পরিবেশ গড়ে উঠেছে। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী শাওন খান বলে, ‘বই পড়ি, যেটা বুঝতে অসুবিধা হয় পাঠাগারে এসে বড় ভাইদের কাছে বুঝে নিই।’
পাঠাগারটিতে প্রতি দুই বছর পরপর পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তন করা হয়। বর্তমান সভাপতি তরিকুল ইসলাম জানান, এই পাঠাগারের উদ্যোগেই কলেজটি চালু করা হয়েছে। বর্তমানে পাঠাগারে ৭০ জন সদস্য রয়েছেন। তাঁরা নিয়মিত বই নিয়ে পড়েন। এখানে ভর্তি চাঁদা ২৫ টাকা। মাসে চাঁদা দিতে হয় পাঁচ টাকা করে।
অর্জুনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী মোল্লা বলেন, এই পাঠাগারের উদ্যোগে প্রতিবছর বইমেলা ও বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়। একে কেন্দ্র করে এই গ্রামে জ্ঞানচর্চার একটি পরিবেশ গড়ে উঠেছে।