শুশুয়ার চরে

200 জন পড়েছে

এক মিনিটের বেশি নয়

আমরা যখন তীরে নামলাম দেখলাম একদল লোক মাথায় করে আস্ত একটা ঘর নৌকায় তুলছে। নদীর মাঝখানে নিরাপদ দূরে থাকা চরে এই ঘরটি তুলবে। ঘড়ের মালিক জমির ব্যাপারির সাথে কথা হয় আমাদের। বয়স ৪০। মুখে বসন্তের দাগ। উসকো-খুসকো চুল। চুল অধিকাংশই পাকা। ইস্পাতের মতো বলিষ্ঠ দেহ। ভাঙা চোয়ালের মুখ থেকে যখন কথা বের হয় মনে হয় ইস্পাতের ধাতব শব্দ বেরুচ্ছে। “আমার এই দুই কুড়ি জীবনে ১৭ বার ঘর বদল করেছি। একবার শুশুয়া তো পরের বার তালতলায় তার পরের বার বিহারির চরে কিংবা তিনশ বিঘার চরায়। এইভাবে একটার পর একটা চর বদলাইছি। তবু যমুনার কোল ছাড়ি নাই। মনে অয় এই মাগীডার প্রেমে পড়ছি”। কথাগুলো শুনে হেসে উঠি আমরা। পরক্ষণেই শিউরে উঠি। যে ঘরে আমার জন্ম হয়েছে, যে আঙ্গিনায় আমার নাড়ি পোঁতা হয়েছে, শ্রাবণের মাঝরাতে ঘুম ভাঙলে যে টিনের চালে ঝমঝম বৃষ্টি পড়ার শব্দ শুনেছি, যে দাওয়ায় বসে আমি প্রথম শিখেছি অ, আ.. সেই ঘর, সেই দাওয়াই সেই আঙ্গিনা ছেড়ে আমি চলে যাচ্ছি, শৈশবের এতটুকু চিহ্ন থাকবে না কোথাও ভাবলেই গায়ের লোমগুলো কেমন কাঁটা দিয়ে উঠে। অথচ এরা! কী দারুণ অভিযোজন ক্ষমতা এদের।

নলিনবাজার ঘাট থেকে বেলা ১১টা সময় নৌকা ছাড়ে আমাদের। ঢাকা থেকে এসেছে শাহারিয়ার ভাই, জিলানি ভাই, রুশদ স্যার, শিশিরদা আর বাবু ভাই। অর্জুনা অন্বেষা পাঠাগারের সপ্তম নৌ-বিহার এটা। অন্যান্য ভ্রমণের চেয়ে এবারেরটা একটু ব্যতিক্রম। গত বছর থেকেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যমুনার চরগুলোতে আমরা শুধু ঘুরবো না সাথে কিছু কাজও করব। তাই এবার সিদ্ধান্ত হয়েছিল চরের স্কুলগুলোতে আমরা কিছু শিক্ষা উপকরণ দেবো। সেই মোতাবেক মাস তিনেক আগে সভাপতি শোয়েব তালুকদারের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি দল গিয়েছিল চরের স্কুলগুলো পরিদর্শন করতে। তাদের মতে ‘কী নেই তা লিস্টি করার চেয়ে কী আছে তা লিস্ট করা অনেক সহজ’। ভাঙ্গা টিনের ঘর, কয়েকটা করে কাঠের চেয়ার, টেবিল, বেঞ্চ আর কয়েকজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক। ওদের পরামর্শ অনুযায়ী আমাদের ক্ষুদ্র সামর্থ্যে যা কুলায় তা দিয়ে ৩টা টিউবওয়েল, ১টা বইয়ের আলমারি নিয়ে রওনা দেই চর শুশুয়ার উদ্দেশে।

প্রায় এক ঘণ্টা নৌকা চলার পর আমরা পৌঁছে যাই শুশুয়ার চরে। নদী থেকে প্রায় ১৫০ গজ দূরে স্কুল। স্কুলের প্রধান শিক্ষক লিয়াকত স্যার নলিন থেকে আমাদের সাথেই এসেছেন। পশ্চিম পাশের ঘরটার চাল ছিল না। দেখা যাচ্ছিল হঠাৎ বেড়ে উঠা ধিঙ্গি মেয়ের মতো। স্যার বুঝতে পেরে হেসে বললেন গত দুইদিন আগে কালবৈশাখীর ঝড়ে উড়িয়ে নিয়ে গেছে। আমরা তো থ।

সাগর, হাসান, অপু, মামুন, দুখু, রুশান ওরা পাঠাগারের সদস্য। টিউবওয়েলের মাথা, পাইপ, বুক সেলফ ধরাধরি করে নামাচ্ছে । সমাজ উন্নয়নের ভাবনা নিয়ে একদিন এই পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। হাতে কলমের কাজ করতেই এখানে এসেছে তারা।

সে দিন ছিল শুক্রবার। জুম্মার নামাজ শেষে আশপাশের আরো তিনটি ইস্কুলের ছাত্র-শিক্ষকরা এস জড়ো হয় শুশুয়া স্কুলের মাঠে। তাদের সাথে মত বিনিময় হয় পাঠাগারের সদস্যদের। চরের শিক্ষার মান উন্নয়ন, ছাত্র-শিক্ষকের সমস্যা, বিজ্ঞান শিক্ষার দুর্বলতা, পাশের হার, ইত্যাদি নান বিষয় উঠে আসে সে আলোচনায়। তবে যে সমস্যার কথা সবচেয়ে বেশিবার উঠে আসে তা হলো নদী ভাঙ্গন। নদী ভাঙ্গন যমুনা নদীর বাস্তবতা হলেও এবং তার সাথে চরের মানুষের অভিযোজন ক্ষমতা বেড়ে উঠলেও সমস্যা স্কুলের ক্ষেত্রে। স্কুল স্থানান্তরের ক্ষেত্রে অনেক সময় হারিয়ে যায় মূল্যবান আসবাবপত্র, অনেক সময় স্থানান্তরও সম্ভব হয় না। তখন পুরো স্কুলটাই হারিয়ে যায় যমুনার গর্ভে। তাই কেউ কেউ পরামর্শ দিলেনÑযদি একটা স্থায়ী লোহার পাটাতনের উপর স্কুল দেওয়া যায় এবং ফেরির মতো এখানে সেখানে স্থানান্তর করা যায় তবে এ সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যায়। অর্থ অপচয়ের সম্ভাবনাও কমে আসে শূন্যের কোঠায় আর নির্বিঘেœ পাঠদান কর্মসূচিও চলবে সারা বছর।

জৈষ্ঠ্যের তেতো রোদ হেলে পড়েছে পশ্চিমে। কিছুটা মোলায়েম হয়েছে । আমরা ফিরতি পথের পানে পা বাড়ালাম। আমাদের ছায়া পুবে দীঘল থেকে দীঘলতর হচ্ছে। বিদায় জানাতে ঘাটে এসেছেন লিয়াকত স্যার, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আর বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্যরা। ঘাট থেকে ১৫০ গজ দূরে স্কুল। দু’দিনের মধ্যে সরাতে হবে টিনের ঘরের এই বিদ্যালয়টি। তা না হলে যমুনার পেটের আহার হবে সে। তাই নিয়ে আলোচনা করছিলেন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্যরা।

আমরা যখন নৌকায় উঠবো, দেখি ৭০ বছরের এক বৃদ্ধ বসে আছে নদীর পাড়ে। লিয়াকত স্যার কথা বলছিলেন তার সাথে। দু’দিন আগের কালবৈশাখীতে ঘরের চাল উড়ে গেছে যমুনার বুকে। ল–ভ- হয়ে গেছে তার সংসার। বৃদ্ধাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন বিহারির চরে মেয়ের কাছে। ছেলেরা গার্মেন্টেস-এ চাকরি করে ঢাকায়। জীবনের এই শেষ বেলায় হিসেব মিলাতে বসেছেন নদীর পারে। কিন্তু সেখানে বড়ই গোঁজামিল। এরকমই কতশত বৃদ্ধের হিসেবের খাতা যে জমা পড়ে আছে এ নদীর বালুর চড়ায় তার কোনো ইয়ত্তা নেই।

নৌকা কাশবনে ঢুকতেই আমাদের চোখ থেকে হারিয়ে যায় শুশুয়ার চর। দু’ধারে মাইলের

পর মাইল বিস্তৃত যমুনা নদী। মাঝে মাঝে কাশ আর বালুর চর। মাঝি ইয়াদ আলি বলছিলেন “এখন তো জ্যোষ্ঠ্য, বর্ষায় এই নদীর যৈবন আইবো। তখন মাইলের পর মাইল খালি পানি আর পানি। একখানের চর ভাঙবো আবার আরেক খানে চর গড়বো। এইডাই হইলো এই নদীর খেলা”।