শাহপরীর দ্বীপে

53 জন পড়েছে

এক মিনিটের বেশি নয়

লক্কর-ঝক্কর জিপগাড়ি হেলে দুলে আমার হাড়-হাড্ডিগুলোকে যথা স্থানে রেখে যখন দেশের দক্ষিণের জনপদ শাহপরী দ্বীপে এসে থামল তখন বেলা পশ্চিমের দিকে পক্ষপাতিত্ব করছে।জেলে পাড়ার প্রাথমিক বিদ্যালয় ছুটি হলো মাত্র। নাকে এসে সম্ভাষণ জানালো শুটকীর খুশবু। বামপাশে নাফ নদী।তার পরেই অন্যদেশ, মায়ানমার।

নাফ নদীর পারের শহর টেকনাফ। বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের থানা। টেকনাফ থেকে শাহপরী যেতে সময় লাগে ১ ঘন্টা। বছর দুয়েক আগে বাধ ভেঙ্গে সব এলোমেলো করে দিয়েছে শাহপরীরর সাথে টেকনাফের যোগাযোগ ব্যবস্থার। রাস্তার চরম বেহাল অবস্থা। দু’পাশে লবণের জমি বিধস্ত। হাজার হাজার লবণচাষীর কপালে হাত।

শুটকীর খুশবুই বলে দিলো আমরা জেলে পাড়ায় এসে গেছি। তাদের ভাঙ্গা-চোরা ঘড় জানান দিলো তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা । শাহপরী নেমেই খোজঁ করি ওখানকার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের। দ্বীপের ৪০ হাজার মানুষের জন্য একটিই মাধ্যমিক বিদ্যালয় সেখানে। স্কুল ছুটি হয়ে গিয়েছিলো । দেখি প্রধান শিক্ষক টিভি দেখছেন বসে বসে। বললাম- আমি আপনাদের কিছিু ভিডিও টিউটেরিয়াল দিতে চাই। আপনাদের ল্যবটপটা দিলে তাতে আমি দিয়ে যেতে পারি।

খুব একটা উৎসাহ দেখালেন না। বললেন তার বাড়ি এখানে না ।চকরিয়ায়। সব শিক্ষকই এসেছেন বাইরে থেকে । এলাকার মানুষেরও লেখা-পড়ায় উৎসাহ কম।মাদ্রাসা শিক্ষায় তাদের ঝোঁক। মেয়েদের ১৩/১৪ বছর হলেই বিয়ে-শাদি অবধারিত। ছেলেদের মধ্যে বেশির ভাগই যায় পৈতৃক পেশা মাছ ধরায় অথবা বিদেশ গমন।কম্পিউটার শিক্ষক কিছুক্ষণ পরে বললেন তাদের কম্পিউটার নষ্ট। ফলে আমার আর টিউটেরিয়াল দেয়া হলো না।

চলে আসি ঘটের পারে। সূর্যিমামা সুবোধ বালকের মতো পশ্চিমের আকাশে রঙ্গের আবির ছড়াচ্ছে।সমুদ্রের বাতাশ এসে আনমনা করে দিচ্ছে আমাকে। ব্যাথা নাশক এ বাতাশ। আমি জেটির উপরে হাটছি।কয়েকটা গাঙচিল উড়ে গেল মাথার উপর দিয়ে। জোয়ারের অপেক্ষায় বসে আছে জেলে নৌকাগুলো । কাদায় একটা চিড়িং মাছ আটকা পড়ে লাফাচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে।

কই যাবেন ? জিজ্ঞাসিলেন একজন বিজিবি সদস্য। এইখানেই এসেছি। সেন্টমার্টিন যাওয়া যাবে? প্রশ্ন করলাম তাকে।এখন যেতে চাইলে স্পিড বোডে যেতে হবে। ভাড়া বেশি নিবে। আর ৮ জন হলে ৩০০ টাকা করে নিবে। টাকার কথা শুনে ভিমড়ি খেলাম আমি। আপাদতো মনকে ঘুস দিয়ে বললাম, চিন্তা করিস না সেন্টমার্টিন যেতে না পাড়লেও এই নাফের পাড়েই থাকবো আহা! ‍কিছুক্ষণ পড়ে বুঝলাম সেখানেও বিধি বাম।

কে যেন বলেছিলো বাংলা ভাষা সিলেটে ব্যহত, বরিশালে আহত, নোয়াখালিতে নিহত আর চট্টগ্রামে সমাহিত। এই নাফ নদীর পারে এসে তার কিছুটা ঠাহর করতে পারলাম।শাহপরীতে একটা সরকারি গেস্ট হাউজ আছে। কিন্তু তার কেয়ারটেকারকে খুঁজে পেলাম না। অগত্যা বাধ্য হয়েই আমাকে ফিরে যেতে হলো টেকনাফে ‍সুজিত দার কাছে।

সমস্ত আকাশে সাদা খইয়ের মতো ছড়িয়ে আছে তারাগুলো । সুজিতদা আমাকে নিয়ে গেল মাথিনের কুয়া দেখতে। মাথিইন, একটি রাখাইন মেয়ে । যে ভালোবেসেছিলো এখানে চাকরি করতে আসা কলকাতার এক বাঙ্গালী যুবককে।তাদের দেখা হয়েছিলো এই কূপে পানি নিতে আসার সময়। তারপর তাদের চারচোখের কথা বিনিময়। তারপর প্রেম। কথা ছিলো কেউ কাউকে ছেড়ে যাবে না। কিন্তু ঐ যুবক একদিন না বলে চলে যায় কলকাতায়। মাথিইন বন্ধ করে তার খাওয়া দাওয়া। আস্তে আস্তে নি:শেষ করে ফেলে সে নিজেকে।

কালপুরুষ তখন পশ্চিমের আকাশে অস্তগামী, সুরাইয়াও তার অনুগামী, আর উত্তরের আকাশে মানব মনের এই অজ্ঞেয় রহস্যকে পরিহাস করে প্রশ্নবোধকের মতো করে উঠছে সপ্তর্ষি।

( গ্রাম পাঠাগার আন্দোলনকে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেয়ার জন্য এবার ৫ই মার্চ থেকে ১৬ই মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগের নানা জায়গায় ঘুড়ে বেড়াই। তার টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতা শেয়ার করবো আপনাদের সাথে। পথ খরচের ৭ হাজার টাকা দিয়েছিলেন হোপ বাংলাদেশের জিন্না ভাই। আর নানা জায়গায় থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন গ্রাম পাঠাগার আন্দোলনের শুভাকাঙ্খিরা। একদিন আমাদের স্বপ্ন সফল হবেই- প্রতি গ্রামে হবে একটি পাঠাগার। ধন্যবাদ সকলকে।)