মিছিল থেকে ফিরে

হঠাৎ করেই চারুকলার ভিতরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ি। লোকজন হুরোহুরি করে ঢুকে পড়ছে চারুকলার ভিতরে। কী হচ্ছে ঘটনাটা দেখার জন্য আমি আর ছোট ভাই মিঠু এগিয়ে যাই । কিছু বুঝে উঠার আগেই টিয়ার শেলের ঝাঁঝ এসে চোখে লাগে।চারুকলার ভিতরে ঝড়া পাতা আর বর্ষ বরণের জন্য ফেলনা টুকিটাকি দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে ঝাঁঝ কমানোর চেষ্টা চালাচ্ছি। মেয়েদের অবস্থা ছিলো ভয়াবহ। তাদের অনেকেই অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যাচ্ছিল। চারুকলার ছেলে –মেয়েরা সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছিল তাদেরকে সুস্থ করার জন্য। পরে তাদের সহযোগিতায় সূর্যসেন হলের পাশ দিয়ে দেয়াল টপকিয়ে অবরুদ্ধ অবস্থার মুক্তি ঘটে। তখনো মিছিল চলছিল।
একটু ঝাঁঝ কমলেই মাঝে মাঝে গেট দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করছিলাম- বাইরে কী হচ্ছে। প্রথম দিকে পুলিশ এগিয়ে গেলেও ছাত্রদের প্রতিরোধের মুখে তারা পিছনের দিকে চলে আসে।একটা ছেলেকে দেখলাম মিছিলের অনেকে আগে জাতীয় পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।মুহুর্মুহু শেল নিক্ষেপ হচ্ছে। এর মাঝে খানেই তাকে দেখলাম পতাকা হাতে এগিয়ে যেতে । কতোক্ষণ টিকতে পেরেছিল জানি না। কিন্তু ভিতরে ওদের জন্য একটা আবেগ তৈরি হয়েছিল সেটা লুকাতে চাচ্ছি না। কারণ মিছিলটা যখন শুরু হচ্ছিল তখন আমি ছিলাম মসজিদের সামনে।প্রায় হাজার পাঁচেকের মতো শিক্ষার্থী। সবার হাতেই বঙ্গবন্ধুর ছবি, বিভিন্ন দাবিসম্বলিত ব্যানার। কণ্ঠে জয় বাংলান স্লোগান।বিষয়টা খুবই ভালো লেগেছিল। কারণ বঙ্গবন্ধু আর জয় বাংলা কারো একার বাপ –দাদার সম্পত্তি না। সমস্ত বাংলাদেশের মানুষের সম্পত্তি। গণজাগরণ মঞ্চের পরে এই আন্দোলনের কর্মীরাই এটা উপলব্দি করেছে সেই জন্য তাদের ধন্যবাদ। আর যেদিন বাংলাদেশর রাজনৈতিক দলগুলো এই স্লোগানকে ধারণ করবে সেইদিনই আমাদের সত্যিকারের সাংস্কৃতিক মুক্তি আসবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
এবার আমি এই আন্দোলন সম্পর্কে আমার কিছু ব্যক্তিগত মতামত তুলে ধরবো। আন্দোলনটা হচ্ছে মূলত জাতীর শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধার ছেলে-মেয়েদের বিশেষ সুবিধে প্রদানের জন্য। এমনকি সেটাকে বর্ধিত করা হচ্ছে তাদের নাতি নাতনীদের জন্যও। মূলত এটা নিয়েই আন্দোলন।
এখন কথা হচ্ছে স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরেও রাষ্ট্র এখনো মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণতালিকা প্রকাশ করতে পারে নি। ফলে আমরা নানা সময় দেখতে পাই বিভিন্ন অসৎ লোক অবৈধ উপায়ে এই তালিকায় ঢুকে যাচ্ছে। যা এখনো প্রক্রীয়াধীন। কোটা প্রথার সুবিধার জন্য আমি ব্যক্তিগত ভাবেই অনেককে চিনি যারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজেদের নাম লিখানোর জন্য। বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধাদের বইয়ে আমি পড়েছি দেশ স্বাধীন হবার পরে পাকিস্তানীদের ফেলে রাখা অশ্র হাতে নিয়েও কেউ কেউ মুক্তিযোদ্ধা সেজে যান। তাদেরকে মুক্তিযোদ্ধারা কৌতুক করে বলতেন ১২ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা। ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ ছিলো একটি সত্যিকারের জনযুদ্ধ। যেখানে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি মানুষ যুদ্ধে জাড়িয়ে পড়েছিল ।গুটি কয়েক রাজাকার আলবদর আল শাসস বাদ দিলে। আমি আমাদের টাঙ্গাইল এলাকার মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে পারি। কাদেরীয়া বাহিনীর নিয়মিত সদস্যের বাইরেও একটি বিশাল স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে উঠেছিল। তাদের কাজও নিয়মিত বাহিনীর চেয়ে কম নয়। তাদের এই সব কর্মকাণ্ডের জন্যও তাদের অনেক ঝুকিঁ নিতে হয়েছে। বিশেষ করে ভূঞাটুরের ছাব্বিষা গ্রামের কথা বলতে পারি। মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করার জন্য সেখানে ন্যক্কারজনক গণহত্যা চালানো হয়। এই সব কথা বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিক, আনোয়ার আলম শহীদ ও ড. নরুন নবী তাদের বইয়ে লিখে গেছেন।

আমার মনে হয় না কোন মুক্তিযোদ্ধা জাগতিক কোন সুখ সুবিধার জন্য এই যুদ্ধে গিয়েছিলেন। তারা যুদ্ধ করে ছিলেন এই দেশের মানুষের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য।যারা জীবনকে বাজি রেখে এই রাষ্ট্রটার জন্ম দিল সেই রাষ্ট্রটা পরিচালনা করবে যোগ্য দক্ষ, মেধাবী, পরিশ্রমীরাই। ষেখানে কোটা প্রথার নামে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবী, কম যোগ্য লোকদের নিয়ে পরিচালনা করলে রাষ্ট্রের কী সুষ্ঠু বিকাশ হবে? যে স্বপ্ন নিয়ে তারা দেশ স্বাধীন করেছিলেন হবে কী সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন? অপরদিকে দেখা যাচ্ছে এই কোটা প্রথার কারণে যে যোগ্য লোকেরা বঞ্চিত হচ্ছে তার ভিতর জন্ম নিচ্ছে ক্ষোভ । অনেক সময় তার প্রতিক্রিয়ায় দেখা যাচ্ছে – তারা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে কথা বলছেন জাতীর এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নিয়ে। যেটা আমাদের জন্য একটা চরম লজ্বার বিষয়।

এই অবস্থায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্থের মতো কোটা প্রথার বন্দোবস্থ করা কতোটা সমীচীন সেটা ভেবে দেখার জন্য আমি সরকারকে অনুরোধ করবো। নির্বাচনের এই বছরে এই ধরণের আন্দোলন সরকারের জন্য ফলদায়ক কিনা সেটাও ভেবে দেখার বিষয়। একই সাথে ধন্যবাদ জানাচ্ছি বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে। এই আন্দোলনে তারা যে অবস্থান নিয়েছে সেটা সত্যিই প্রসংসার যোগ্য। কেউ কেউ তাদের ব্যাক্তিগত মতামত প্রদান করেছেন যা বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতে সুস্থ হাওয়ার প্রবাহ বলে বলতে পারি।

একই সাথে আন্দোলন কারীদের প্রতি আহ্বান থাকবে অহিংস উপায়ে আন্দোলন চালিয়ে যান।
অনেকেই ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করবে। আপনারা বুঝে শুনে পদক্ষেপ নিবেন। আমার মনে হয় এই আন্দোলন সরকারের বিরুদ্ধে না সরকারের একটা সিস্টেমের বিরুদ্ধে। তাই সরকারকে বুঝে শুনে সহানুভুতির সাথে এই সমস্যার সমাধান দিতে হবে।না হলে মনে রাখবেন বিশাল খড়ের গাদা পুড়ানোর জন্য একটা দেশাইয়ের কাঠিই যথেষ্ঠ।
গেল শতকের বিশের দশকে পিছিয়ে পড়া মুসলমাদের এগিয়ে নিতে এবং হিন্দু মুসলমান ঐক্য সুদূঢ় করতে চিত্তরঞ্জন দাশ বেজ্গল প্যাক্টের প্রস্তাব করেন।। তিনি কলকাতার মেয়র হওয়ার পর সেটা বাস্তবায়নএর চেষ্টাও করেন।ফলে মুসলমানদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যায়। কিন্তু হতাশা সৃষ্টি হয় উঠতি মধ্যবৃত্ত শিক্ষিত হিন্দুদের মাঝে। । কারণ তারা দেখছিলেন যে এতে তারা বিভিন্ন চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাঁর ফলাফল আমরা দেখি ৪৭ এ। দেশ ভাগের জন্যেই এই শ্রেণিটাই বেশী উদগ্রিব ছিলো। তাদের ভয় ছিলো যুক্ত বাংলা হলে সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলমানই বেশি চাকরি পাবে কোঠা প্রথার কারণে। তাই তারা চাচ্ছিলেন বাংলা ভাগ হোক।ফলে আমরা দেখতে পাই শরৎবসু ও শহরাওয়ার্দি শেষ চেষ্টাও কীভাবে ব্যার্থ হয়ে যায়। ( দেশ ভাগের অনেক কারণের মধ্যে এই কোটা প্রথাকেও একটা অন্যতম কারণ বলে মনে করি)।
ট্যাগ সংস্কৃতির সময় এই ধরণের পোস্ট দেয়া অনেকটা ঝুঁকি পূর্ণ। তবুও নিলাম। কারণ সময়ের কথা সময়েই বলতে হয়। তা নাহলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়। কিন্তু তার ফলাফল হয় ভয়াবহ।
জয় বাংলা।

আপনার মতামত লিখুন :