মহজিদ পাড়ার বাতিঘর

45 জন পড়েছে

এক মিনিটের বেশি নয়

কিছুদিন আগে আমাদের সময়ে গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন নিয়ে একটি লেখা প্রকাশিত হয়। তাই পড়ে এক ভদ্রলোকের ফোন “ আমি আবু হেনা। নওগাঁ বাড়ি। আমাদের একটি পাঠাগার আছে । একদিন আসেন না দেখতে। নওগাঁ! কয়েকদিন আগে জাকির তালুকদারের পিতৃগণ পড়ে নওগাঁর প্রেমে পড়ে গেছি। সত্যি বলতে কী দিব্যেক রুদক আর ভীমের প্রেমে পড়ে গেছি। এইসব ভূমিপুত্রদের স্মৃতি বিজড়িত বরেন্দ্রই আজকের নওগাঁ। ফলে আর দেরি না করে রাজি হয়ে গেলাম।
মহজিদ পাড়ার দিকে মেশিন চালিত আমাদের ভ্যান এগিয়ে যাচ্ছে। সাপাহারের একটি গ্রাম মহজিদ পাড়া। বরেন্দ্রের এই অসমতল লালময় সবুজাবৃত ভূমি আমাকে মুগদ্ধ ও বিমোহিত করছে। পাশে বসা আকাশ ভাই বলে যাচ্ছে দিব্যেক আর বীমের কথা। বলে যাচ্ছে তাদের অতীত ইতিহাস আর ঐতিহ্যের কথা। আজ থেকে এক হাজার বছর আগে ভূমিপুত্র কৈবর্ত নেতা দিব্যেকের নেতৃত্বে মহিপালকে পরাজিত করে কীভাবে এখানকার ভূমিপুত্ররা স্বাধীনতা অর্জন করেছিলো। টানা ৩৭ বছর স্বাধীন রেখেছিলো এই বরেন্দ্রভূমি। সেইসব গল্প শুনে আমার বুকটাও ভরে যাচ্ছে গর্বে। ছবির মতো একেকটা গ্রাম। সারি সারি তালগাছ, আমের বাগান আর তারই বুকচিরে সাপের মতো একেবেকে চলে গেছে একেকটি রাস্তা। রাস্তার দু’পাশে মাটির ঘর। এক কথায় আমি যেন হাজার বছর আগের কোন গ্রামের ভিতর দিয়ে যাচ্ছি। কখন যে মহজিদ পাড়া এসে পৌঁছেছি বুঝতেই পারি নি। আবু হেনা ভাই বরণ করে নিলেন আমাদের। মাটির দেয়ালের চারচালা টিনের ঘর। বারান্দার মেঝেতে বাচ্চারা বই পড়ছে। ভিতরে চলছে নানা প্রতিযোগিতা। কিছুক্ষণ পরেই পুরস্কার দেয়া হবে। পুরো পাঠাগার প্রাঙ্গন জুড়েই একটা উৎসব উৎসব আমেজ।
এরই মাঝে নওগাঁ থেকে রায়হান ভাইয়ের নেতৃত্বে জহির রায়হান চলচ্চিত্র সংসদের ৭/৮ জনের একটি দল এসে উপস্থিত হলেন । আবু হেনা ভাই আমাদের নিয়ে বসলেন পাঠাগারের বারান্দার মেঝেতে। বললেন তার স্বপ্নের জন্মকথা। এই ঘরটি ছিলো তাদের ভাঙ্গা আসবাবপত্র রাখার জায়গা। বাব-চাচা তিনজনই গত হয়েছেন। সেও চাকরি সূত্রে ঢাকায় থাকে। ছেলে-মেয়েরা সবাই যার যার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। বাড়িটি অব্যবহৃত পড়ে থাকে। ভাবলেন বাব-চাচার স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য একটা পাঠাগার দিলে কেমন হয়। ছেলে-মেয়ে, ভাই-ভাইস্তা সকলেই রাজি। শুরু হয়ে গেল পাঠাগার স্থাপনের কাজ। নাম দিলেন- “জামাল কামাল জালাল স্মৃতি পাঠাগার”। যা এখন এই মহজিদ পাড়ার একমাত্র বাতিঘর।
আড্ডার মাঝে মাঝে বাড়ির ভিতর থেকে আসছে নানান স্বাদের পিঠে। আর পাঠাগারের ভিতরে চলছে কবিতা, ছবি আকাঁ, গল্প লেখার প্রতিযোগিতা। দায়িত্বে আছে ছেলে ইফতি, মেয়ে মৌ । মৌ জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংলিশে অনার্স মাস্টার্স শেষ করে একটি কলেজে লেকচারার হিসেবে জয়েন করেছে। ভাবতেই ভালো লাগছে, এভাবে সবাই যদি তাদের নিজ নিজ গ্রাম নিয়ে ভাবতো , নিজেদের গ্রামে পাঠাগার স্থাপন করতো তাহলে আমাদের গ্রামগুলো কতোনা সুন্দর হয়ে গড়ে উঠতো। একসময় আমাদেরও ডাক পড়লো ভিতরে । বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দিতে হবে। মৌ একে একে ঘোষণা করছে বিজয়ীদের নাম। আমরা একেকজন বিজয়ীদের হাতে তুলে দিচ্ছি কলম, রংপেন্সিল, বই। আর অভিভূত হয়ে দেখছি আগামীদিনের দিব্যেকদের – যাদের হাতেই নিরাপদ আমাদের এই বাংলাদেশ।