প্রতিকূলের যাত্রী

এক মিনিটের বেশি নয়

কপোতাক্ষ নদ পেরুলেই শতাব্দি প্রাচীন মহেশপুর পৌরসভা। শেষ বিকেলে রোদ্রের তেজ কমে এসেছে। বাস থেকে নামতেই ধাক্কা খায় চোখ। শহরের প্রাণকেন্দ্রে ভাঙ্গাচোড়া একটা মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য্য । কয়েকজনকে বলি এ হাল কেনো। “ঢাকাতে যেন কী হয়েছিলো তারই প্রতিক্রিয়ায় এখানকার জামাত-শিবিরেরা এটা করেছে।” বললেন এক ভ্যানচালক। আমার আর এখানে থাকতে ইচ্ছে হলো না। লোকজনকে বলি কালুদহে যাওয়ার উপায় কী? সেতো অনেক দূরের পথ। ভাঙ্গা রাস্তা। কয়েকদিনের বৃষ্টিতে রাস্তার অবস্থা বেহাল।

কেউই যেতে রাজি হচ্ছে না। কালুদহে কার বাড়ি যাবেন। টুটুল ভাইয়ের বাড়ি। “ও পাঠাগার আছে যে বাড়িতে । আহেন , আমার গাড়িতে আহেন।” আমি বলি ভাড়া কতো নিবেন। “ও সমস্যা হবে না,ওনারে আমরা চিনি।গেল ১০ বছর ধরে ওনি প্রেতেকদিন পেপোরে নিগা এই শহরে আহেন সাইকেল চালাইয়া। এই রাস্তার দুবলা ঘাসও তারে চিনে”

কালুদহ ছোট্র একটা গ্রাম। প্রায় হাজার দেরেক মানুষের বাস। গ্রামে কোন শিক্ষা প্রতিষ্টাণ নেই । নেই বাজার। সামান্য প্রয়োজনেই তাদের যেতে হয় বাথানখোলা বাজারে। কয়েক কিলো হেটে। আছে সুদখোরদের দৌরাত্ম। তাদের ফাঁদে পড়ে কয়েক পরিবার হারিয়েছে সর্বস্ব।তারা এখন ভিটে ছোড়া, আছে হিংসা, দ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা আর আছে টুটুল ভাই ও তার মাতৃভাষা পাবলিক লাইব্রেরি।

৩০/৩২ বছরের যুবক টুটুল। কলেজে পড়ার সময়ই অন্ধকার দূর করার প্রত্যয় নিয়ে নিজের বাড়িতেই ২০০১ এ প্রতিষ্ঠা করেন এই পাঠাগারটি। ছোট ছাপড়ার মতো এই ঘড়টিতে প্রায় তিন হাজার বই। এর মধ্যে দেড় হাজার বই তাকে স্তুপ করে রাখতে হয় বুক সেলফের অভাবে। ৬ মাস পরপর স্তুপে রাখা এই বইগুলো সেলফে উঠান।প্রতিদিন রাখা হয় কয়েকটি জাতীয় দৈনিক। এই পত্রিকাগুলো আনতে তাকে প্রতিদিন ৯ কিলো পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয় মহেশপুরে।

ঘড়টির অবস্থা পড়পড়। যে কোন সময় ঝড়ে উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারে ঘঢ়টি। বৃষ্টি হলেই পানি পড়ে। সদস্য আছে প্রায় একশর উপরে।সদস্যদের দিতে হয় না কোনো মাসিক চাঁদা, কিংবা জামানত ফিস।

শুধু বই পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই তাঁর পাঠাগার কার্যক্রম্ । নানা সেবামূলক সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে তারা। তার মধ্যে বৃক্ষ রোপন একটি। প্রতি বছর লোকের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ফলজ বৃক্ষের চারা লাগিয়ে আসেন। সেই গাছগুলোতে এখন ফল দিচ্ছে।

একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী তাদেরকে একটা প্রজেক্টর দিয়েছেন। তারা সেই প্রজেক্টর দিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘড়ে বাল্য বিবাহ, যৌতুক, মুক্তিযোদ্ধ বিষয়ে নান ছবি প্রদর্শন করে থাকেন।

পাঠাগারটাকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য একটা ফান্ড গঠণের চিন্তা করছেন তারা। এই পর্যন্ত তাদের সংগ্রহ ৬০০০ টাকা। এই টাকা তারা অলস ভাবে ফেলে না রেখে বিনা সুদে শিক্ষা ও চিকিৎষার জন্য ঋণ দিয়ে যাচ্ছেন গ্রামের দরিদ্র মানুষদের।দরিদ্র মানুষেরা একটা ফরমে সই দিয়ে বিনা জামানতে তাদের সুবিধা জনক সময় পর্যন্ত এই ঋণ নিতে পারছেন। এই ছয় হাজার টাকা দিয়েই তারা ৫০ হাজার টাকার লোন দিতে পেরেছে মানুষদের। ফলে লোকজন আর যাচ্ছে না ঐ সুদখোরদের কাছে। তারাও খেপে আছেেএই পাঠাগারের উপর। সুযোগ পেলেই নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে।

েএখন তারা চেষ্টা করছে একটা মোবাইল পাঠাগার দিতে।সামাজিক কারণে গ্রামের মেয়ে, বউ –ঝিরা এই পাঠাগারে আসতে পরে না। তাই তাদের জন্য একটা ভ্যানে করে বই নিয়ে যাবে বাড়ি বাড়ি।

রাস্তার মোড়ের চা দোকানগুলো হলো গ্রামের লোকদের আড্ডার জায়গা। সেখানে সিডিতে নানা অশ্লিল ছবি চলে,

জ্যেষ্ঠের বৃষ্টি পেয়ে ব্যঙ্গের আনন্দগীত, রাতজাগা পাখির একটানা আর্র্তনাদ, অসংখ্য নক্ষত্রের আকাশের নীচে একই পথের দুই মুসাফির সামনাসামনি বসে। স্রোতের প্রতিকূলে হাটতে হাটতে তারা কিছুটা ক্লান্ত। কিন্তু তবু তারা স্বপ্ন দেখে নতুন ভোরের।

গান বাজে যা গ্রামের পরিবেশকে কুলষিত করছে। েএই ব্যাপারে তারা একটা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সন্ধ্যার পরে তারাও এরকম একটা আড্ডার ব্যাবস্থ্যা করবে। যেখানে তারা চাঁদা দিয়ে চা চিনি কিনবে।পাঠাগার চা তৈরির ব্যবস্থা করবে। আর সিডিতে চলবে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষামূলক নানা ভিডিও

কয়েক বছর আগে গ্রামে একটা প্রাইমারি স্কুল দেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু গ্রামের কিছু মানুষের অসহযোগিতার ফলে তাদের সে কর্মকাণ্ড ভেস্তে যায়। গ্রামে থেকেই কিছু একটা করার ইচ্ছে ছিলো টুটুলের। কিন্তু সে আর হয়নি। গ্রামে মানুষের নিশ্চয়তা দিতে গিয়ে এখন নিজের জীবনই অনিশ্চয়তার চোরাবালিতে বন্ধী।