পূর্ণিমা উদযাপন

142 জন পড়েছে

এক মিনিটের বেশি নয়

 

চাঁদের আলো পিছলে পড়ছে যমুনার জলে। আর তা প্রতিফলিত হয়ে পড়ছে যমুনার চরে, আমাদের গায়ে ।রাসের জোসনা ধারায় স্নান করছি আমরা।লিজু বাউলার কণ্ঠে লালনের গান, মানিকের খমকে, চমকের দোতারাতে আর শিফনের একতারার সাথে পূর্ণিমার আলো মিশে তৈরি হয়েছে এক অপার্থিব সৈন্দর্য। আর সেই সৈন্দর্য উপভোগ করতে আমরা গিয়েছিলাম যমুনার এক প্রতান্ত চর ৩০০ বিঘাতে।
দুপুরে যখন নৌকা থেকে নামি এই চরে তখন অনেকেই বিরক্ত হয়। কী আছে এই চরে। এবারের বন্যার ক্ষত চিহ্ন লেগে আছে এখনো সেখানে। গতবার যে পাড়াটা আমরা দেখেছিলাম সেখানে এখন প্রমত্ত যমুনা। যে দুই একটা ঘর এখন অবশিস্ট আছে সেখানেও ক্ষতের চিহ্ন। সবচেয়ে বেশি বিব্রত অবস্থায় পড়েছিলেন তানভীর ভাই। তিনি অনেক লোভ দেখিয়ে তানিয়া আর অরণি আপুকে নিয়ে এসেছেন। এখন তো দুপুরের তপ্ত রোদ।শুষ্ক বাতাস। সবুজের চিহ্ন তেমন একটা নেই। তো এতো জায়গা থাকতে টাকা খরচ করে এখানে কেন?


ভালো লাগা মন্দ লাগার হিসেব বাদ দিয়ে শাহীন ভাই, চঞ্চল ভাই সফিক ভাইয়েরা নেমে যায় যমুনার ঘোলা জলে স্নান করতে। যমুনার পলি গায়ে মেখে সবাই ভুলে যায় তার বয়সের কথা। মাঝ বয়সী এই বুড়োরা ফিরে যায় তাদের দূরন্ত কৈশরে । ক্লান্ত হয়ে যখন দুপুরের আহার থেতে বসি । তখন সবার চোখে মুখে তৃপ্তির ঢেকুর। আহা কী অমৃত !কতো দিন বাটা মসলার ,মাটির চুলার রান্না খাওয়া হয় না। তৃপ্তি মতো খেয়ে পেটের সাইজ যখন আট মাস বয়সী পোয়াতীর মতোন, নড়া-চড়া করার জো নেই। ফলে যে ত্রিপলে বসা খাওয়া সেখানেই অনেকের দিবা নিদ্রার কসরত করতে দেখা গেল।


হেমন্তের বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে দ্রুত। আলো থাকতে খাকতেই তাবু খাটাতে হবে।শাহীন ভাইয়ের তাড়া। চলে আসি নদীর কূলে। নিহারদা, মাহমুদ ভাই ঠিক করেন কোথায় কোথায় তাবু গাড়তে হবে। ততক্ষণে সূর্য়্য মোলায়েম হয়ে এসেছে।চাঁদের আলোয় ৩০০ বিঘার চর ষোড়শী কন্যার মতো তার সৌন্দর্য় বিলাতে শুরু করেছে। সবার ভিতরের শিশুটা যেন অগোচরে বের হেয়ে এসেছে । তাই সুতা ক্ষেতে লুটোপুটি, বালু খামচিয়ে শিয়ালের খোযাড় বানানো কোন কিছুই বাদ রাখছে না তরা।বগুড়া থেকে আসা খোকন ভাই তার ক্যামেরাতে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন । কিছুক্ষণ পরে আমাদের সাথে যোগ দেয় ডিবিসির ক্যমেরা নিয়ে সোহেল ভাই, দুতারা নিয়ে চমক আর মেহেদী মামা।


সূর্য্য তখন লাল জামা গায়ে দিয়ে দিনের পাঠ চুকিয়ে ফেলতে চাচ্ছে। লাল আবির ছড়িয়ে পড়েছে পুরো পশ্চিমের আকাশে।হঠাৎ করেই একটা বিষয় মাথার ভিতরে এসে টুকা মেরে গেল। মানুষের শেষ বিদায়ে মানুষকে কেন এতো সাজিয়ে দেয়া হয়? কেন আতর চন্দন মাখানো হয়? সেটাও কী এই প্রকৃতির নিকট হতে শিক্ষা। যে ভাবে সূর্য্য বিদায়ের সময় প্রকৃতি সেজে উঠে অপরুপ সাজে।একটা দিনের বিদায় ঘন্টার জন্যই কী প্রকৃতির এই সাজ?


সূর্য্য যখন ডুবে যাচ্ছে তখন রুপার থালার মতো পুবের আকাশে উঁকি মারছে হেমন্তের চাঁদ। জীবনানন্দ যাকে বলতেন কস্তরী আভার চাঁদ। এক অপার্থিব নৈসর্গিক সৌন্দের্যে বিমোহিত আমরা। কিছুক্ষণের মধ্যে চাঁদের আলো আরো তীব্র হতে থাকে। মনে হয় যেন পৃথিবীর সব রাজ কন্যাদের রং চুরি করে এনে ঢেলে দিচ্ছে এই চরে।
ধন্যবাদ জানিয়ে চাঁদের দিকে আমরা পাঠিয়ে দেই ফানুস। হে ফানুস , আমাদের এই আলোর বার্তা পৌছেঁ দেও মাটির মানুষকে। মানুষের রক্ত নিয়ে যারা হোলি খেলে তাদের কাছে পৌছেঁ দেও মঙ্গল বারতা।


রাত গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে। বাউলের কন্ঠে লালনের গান, এক তারার টুংটাং, দোতারার সুর, খমকের শব্দে আমরা হয়ে উঠছি অচিনপুরের মানুষ।যুথী আর আর ঈশিতা আপু বারবিকিউ করছে। আমরা গোল হয়ে বসে আছি আগুনকে ঘিরে একটু উম পাবার আশায়।

যমুনার চরায় আটকে পড়েছে রাশের পূর্ণিমার চাঁদ। আর তার আলোতে স্নান করছি আমরা। এ সেন সেই আদি অনন্ত কালের পূর্ণিমা যার আলোয় স্নান করছি আমি, স্নান করতেন আমার দাদা, তার দাদা, তার দাদা…..। আর অনাগত কালে যারা আসবে তারাও একদিন আমাদের মতোই স্নান করবে।এভাবে তারাও করবে পূর্ণিমা উদযাপন।