নদী ভাবনা।

নদীমাতৃক আমাদের দেশ অর্থাৎ নদীই আমাদের মা। হিমালয়ের পা ধোয়া জলে প্রতিবছর প্লাবিত হয় আমাদের এই প্রিয় জন্মভূমি। প্রতি বছরই অভিশাপ হয়ে দেখা দেয় পদ্মা মেঘনা যমুনাসহ অসংখ্য নদী। আবার তার বয়ে আনা পলিতে উর্বর হয় ভূমি। দক্ষিণে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন চর। যে নদীকে সর্বনাশা বলি, সেই নদী হতে পারে আমাদের আর্শিবাদ। নদীর অপরূপ সৌন্দর্য হতে পারে দেশি -বিদেশি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে নদী হতে পারে আমাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা। সড়ক পথের যানজটের প্রেক্ষিতে নদী হতে পারে আমাদের নতুন আশার আলো। প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্কের দেনদরবারে নদী হতে পারে আমাদের হাতিয়ার।

২৩০টি নদী আর অসংখ্য শাখা প্রশাখা জালের মতো ছড়িয়ে আছে। তারা এক এলাকার সাথে আরেক এলাকার যুক্ত করেছে। এক সময় এই নদীই ছিলো যোগাগের একমাত্র মাধ্যম।বিভিন্ন দাতা গোষ্ঠির অসৎ পরামর্শে আমাদের নিতীনির্ধারকরা নিয়েছেন অনেক আত্মঘাতী সিধান্ত। অপরিকল্পিতভাবে নদীতে দিয়েছেন বাঁধ, নির্মাণ করেছেন ব্রিজ, কালভার্ট । ফলে নদী হারিয়েছে তার স্বাভাবিক গতিপথ। পলি নিষ্কাশনের জন্য প্রাকৃতিক যে খালগুলো ছিলো তার মুখ বন্ধ হওয়ায় পলি রয়ে যাচ্ছে নদীর বুকে। ফলে নদী হয়ে যাচ্ছে অগভীর।বর্ষায় ভাঙ্গছে তার দুতীর।অসংখ্য মানুষ হচ্ছে বাস্তু হারা।

অপরদিকে অতিমাত্রায় সড়ক পথের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় বেড়ে যাচ্ছে পণ্যের আমদানি খরচ। রাস্তায় তৈরি হচ্ছে যানযাট। মাত্রাতিরিক্ত গাড়ি চলাচলের ফলে রাস্তা হারাচ্ছে তার স্থায়িত্ব।আর এ সমস্ত যানবাহনের জ্বালানী খরচ মিটাতে চলে যাচ্ছে আমাদের সাধের বৈদেশিক রিজার্ভ। অথচ ২০টি ট্রাকে যে পণ্য পরিবহন করা যায় তা একটি কার্গো জাহাজ অতি সহজেই তা বহন করতে পারে।এখনো দেশে ৭০০মণ/৮০০ মণ মাল নিয়ে নৌকা দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পণ্য পরিবহন করে থাকে। কিন্তু এটা অতটা জনপ্রিয় না হওয়ার কারণ হলো সুষ্ঠু নিতীমালার অভাব, নিরাপত্তার অভাব, আর শুষ্ক মৌসুমে নদীর অগভীরতা। যদি উপযুক্ত নীতিমালার মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে এই নদী পথ চালু রাখা যায় তাহলে দেশের রাস্তাগুলোর উপর থেকে যে প্রভুত চাপ কমে আসবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কমে আসবে জ্বালানী তেলের চাহিদাও।

আমরা এ ব্যাপারে অন্ধ হয়ে থাকলেও বসে নেই কিন্তু পাশের দেশ। তারা যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে নদীকে ব্যবহার করার জন্য নিচ্ছে নানা ধরণের প্রকল্প। ইতোমধ্যে ভারত ব্রহ্মপুত্র নদের তাদের অংশে খনন কাজ শুরু করেছে।সাদিয়া থেকে ধুবরি পর্যন্ত ৮৯১ কিলোমিটার খনন করবে তার। বাংলাদেশের সাথেও চুক্তি হয়েছে ভারতের।তারা বাংলাদেশের ২টি নদী খনন করে দিবে। যমুনা নদীর সিরাজগঞ্জ থেকে দই খাওয়া অংশ পর্যন্ত ১৭৫ কিলোমিটার এবং কুশিয়ারা নদীর আশুগঞ্জ থেকে জকিগঞ্জ পর্যন্ত ২৯৫ কিলোমিটার খননের চুক্তি হয়েছে। এতে খরচ হবে ৩০৫ কোটি রুপি।

নৌপ্রটোকল চুক্তির আওতায় আসা-যাওয়ার উভয় দিকে ৩টি রুটে মালবাহী জাহাজ চলাচল করছে। রুটগুলো হলো কলকাতা-হলদিয়া-রায়মঙ্গল-চালনা-খুলনা-মংলা-কাউখালী –বরিশাল- হিজলা-চাঁদপুর-নারায়নগঞ্জ-আরিচা-সিরাজগঞ্জ-চিলমারী-ধুবড়া-পাণ্ডু-শিলঘাট
দ্বিতীয়ত কলকাতা-হলদিয়া-রায়মঙ্গল-চালনা-খুলনা-মংলা-কাউখালী –বরিশাল- হিজলা-চাঁদপুর-নারায়নগঞ্জ-বৈরভ বাজার-আশুগঞ্জ-আজমিরিগঞ্জ-মারকুলি-শেরপুর-ফেঞ্চুগঞ্জ-জকিগঞ্জ-করিমগঞ্জ । তৃতীয় রুটি হলো-ধুনিয়া-গোদাগাড়ী-রাজশাহী-নারায়নগঞ্জ-বৈরভ বাজার-আশুগঞ্জ-আজমিরিগঞ্জ-মারকুলি-শেরপুর-ফেঞ্চুগঞ্জ-জকিগঞ্জ-করিমগঞ্জ অপরটি ধুনিয়া-গোদাগাড়ী-রাজশাহী-আরিচা-সিরাজগঞ্জ-চিলমারী-ধুবড়া-পাণ্ডু-শিলঘাট। নতুন চুক্তি হলে হয়তো যাত্রীবাহী জাহজও চলাচল করবে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারেণই বাংলাদেশর সাথে চুক্তি করে চলতে হবে ভারতকে। মানচিত্রের দিকে তাকালেই বুঝা যায় ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চালীয় রাজ্যগুলো স্থলভাগ দ্বার বেষ্টিত। কলকতা বন্দর ব্যবহার করে এই সমস্ত রাজ্যগুলোর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা ব্যায়সাধ্য এবং দূরুহ।কলকাতার সাথে আগরতলার দূরত্ব এক হাজার ৬৮০ কিলোমিটার আর চট্টগ্রাম বন্দরের দূরত্ব ২৪৮ কিলোমিটার। কলকাতা থেকে মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ের দূরত্ব এক হাজার ১৫০ কিলোমিটার, মিজোরামের রাজধানী আইজলের দূরত্ব এক হাজার ৫৫০ কিলোমিটার নাগাল্যান্ডের রাজধানী কোহিমারের দূরত্ব এক হাজার ৪৫০ কিলোমিটার অপরদিকে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে এদের দূরত্ব যথাক্রমে ৫৭০ কিলোমিটার, ৬৫৫ কিলোমিটার, ৮৮০ কিলোমিটার।

কৌশলগত আমাদের এই ভূ-অবস্থানের কারণে যেখানে আমাদের বাড়তি সুবিধা আদায়ের কথা সেখানে আমাদেরই ভুল কৌশলের কারণে হতে হচ্ছে কোণঠাসা। তার প্রমাণ তিস্তার পানি চুক্তি। ভারতের সাথে আমাদের অভিন্ন ৫৪ টি নদী থাকলেও মাত্র চুক্তি হয়েছে ১টি। তাও শুষ্ক মৌসুমে চুক্তি অনুযায়ী পানি পাওয়া যাচ্ছে না বলে মাঝে মাঝে অভিযোগ পাওয়া যায়।দুদেশের সরকার প্রধান রাজি থাকলেও শুধু একটি রাজ্যের মূখ্যমন্ত্রীর বিরোধিতার কারণে চক্তি হচ্ছে না এতোবড় হাস্যকর কথা আমাদের শুনতে হচ্ছে এই কলিযুগে।

অপর দিকে ভারত ইতোমধ্যে আামদের আশুগঞ্জ, চিলমারী নদীবন্দর ব্যবহার করে তারদেশে পণ্য পরিবহন শুরু করেছে। সে জন্য বাংলাদেশকে দিচ্ছে টনপ্রতি ১৫২ টাকা মাত্র। আমি অর্থনীতীবীদ নই । যদি কেউ পারেন একটু হিসেব করে দেখবেন আমাদের বন্দর ব্যবহার করার ফলে কলকাতা থেকে আগরতলার দূরত্ব কমেছে এক হাজার কিলোমিটার। এই একজাহার কিলোমিটারে কতোটা ফুয়েল লাগতো, রাস্তার স্থায়িত্ব নষ্ট হতো, কতোটা সময় নষ্ট হতো , সে সব আমলে নিলে এই ১৫২ টাকা কী যথেষ্ট? কেউ মনে করবেন না আমরা চুক্তির বিপক্ষে। কিন্তু চুক্তি হওয়া উচিৎ পরস্পরের স্বার্থসংষ্লিষ্ট বিষয় মাথায় রেখে। আমাদের দেশের যে সমস্ত পণ্য েঐ সমস্ত রাজ্যে রপ্তানী করা যাবে সেই সমস্ত পন্য কী আমাদের নদী পথ ব্যবহার করে কলকাতা থেকে ঐ রাজ্যগুলোতে নিতে পারবে কী না তা ভেবে দেখা উচিৎ।

বাংলাদেশের মানচিত্রের দিকে তাকালেই দেখবেন বুড়িমারী স্থলবন্দর ও সোনাহাট স্থলবন্দরে অতি নিকটেই নেপাল ও ভুটান। এই দুটি দেশও স্থলদ্বারা বেষ্টিত। ফলে তাদের বন্দর ব্যবহার করতে চাইলে করতে হবে কলকাতা অথবা চট্টগ্রাম বন্দর। নদী যোগাযোগ সুবিধের কারণে তারা চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করতেই বেশী আগ্রহী অথবা মংলা ।

প্রাকৃতিক সৈন্দর্যের লীলাভূমি এই নদীগুলো আর তার বুকে জেগে থাকা চরগুলো। নদীর ‍বুকের এই চরগুলোই হতে পারে আমাদের পর্যটনের নতুন কেন্দ্র। একটু যত্ন নিয়ে ঠিকমতো পরিকল্পনা নিয়ে এগুলে এইচরগুলোই হবে আগামী দিনের পর্যটন শিল্পের প্রাণ ভ্রমরা । তা ছাড়া বিশ্বের প্রাধন দুটি নদী পদ্মা ও ব্রহ্মপুত্র বয়ে গেছে আমাদের দেশের উপর দিয়ে তাই বিদেশী নানা পর্যটক আকুষ্ট হবে এই নদী দুটি দেখতে।
হাতের কাছে থাকতে মানিক আমরা ঘুরি দিল্লি-লাহোর। আগামী দিনে আমাদের সমস্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূলে থাকবে এই নদী। তাই যত দ্রুত নদীকে আমাদের কেবলা করে কাজ শুরু করবো ততই আমাদের মঙ্গল।

আপনার মতামত লিখুন :