জয় আমাদের হবেই।

চালচুলোহীন এক স্কুল মাস্টার আমি। আমাদের গ্রামের মানুষের দির্ঘদিনের স্বপ্ন আমাদের গ্রামে একটি কলেজ হবে। তাদের ছেলে-মেয়েরা পড়বে তাদেরই গ্রামের কলেজে।গ্রামেরই একজন হিসেবে সেই স্বপ্ন আমাকেও তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াতো। খুব ছোট বেলা থেকে সেই স্বপ্ন ভর করলো আমার ভিতরও। গ্রামের ছোট ভাইদের নিয়ে বসলাম । বললাম কলেজ দিতে চাই আমাদের গ্রামে। ওরা বলল – ঠিক আছে”। আমরা সবাই মিলে কাজ করবো।একদম শুন্যহাতে শুরু করেছিলাম। সাথে ছিলো গণমানুষের শক্তি আর ছিলো মহান দুই দার্শনিকের শিক্ষা দর্শন।

ঢাকা শহরের জীবন ছেড়ে ২০১৩ সালে চলে আসলাম গ্রামে ।পরিবারের লোকদের বুঝিয়ে ৭৫ ডিসিমেল জমি নিলাম কলেজের নামে।শর্ত আমাদের দাদাদের বড় ভাই হাজী ইসমাইল খাঁর নামে কলেজটির নাম করণ করতে হবে। আমরাও রাজি হয়ে গেলাম। প্রায় অর্ধ কোটি টাকার সম্পদ আমরা পেয়ে গেলাম বিনে পয়সায়।

জমি তো হলো । এবার মাটি কাটতে হবে। ঘর তুলতে হবে।সেই টাকা পাবো কোথায়? এগিয়ে আসলো অর্জুনা অন্বেষা পাঠাগারের ছোট ভাইয়েরা। তারা স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে মাটি কেটে দিলো কলেজের জন্য।তাদের সাথে যোগ দিলো গ্রামের যুব সামজ। গ্রামের কাঠ ব্যবসায়ী আলী আকবর ভাই বললেন যত কাঠ লাগে নিয়ে যাও। সময় সুযোগ করে টাকা দিও।গত ৫ বছরেও আমরা তার অনেক টাকা শোধ করতে পারি নি।এবার প্রয়োজন টিন। একদিনের পরিচিত সাদিক ভাইকে অনুরোধ করলাম আমাদের কিছু টাকা ধার দেয়ার জন্য। তিনি ৪০ হাজার টাকা দিলেন। এই নিয়ে শুরু করে দিলাম ঘরের কাজ।এগিয়ে আসলেন ফেইসবুকের বন্ধুরা।পরিচিত অপরিচিত অনেক বন্ধুই এগিয়ে আসলেন আমাদের কলেজ স্থাপনে।

কলেজে শিক্ষকতার জন্য এগিয়ে আসলেন বিথী আপা, রিনা আপা আর আশিক। আমরা লেগে গেলাম শিক্ষার্থী সংগ্রহের কাজে। আর তখনই খেলাম চরম ধাক্কাটা।আমরা কোন শিক্ষার্থী পেলাম না। আমরা যে গ্রামের মানুষদের নিয়ে এতো মিটিং করলাম, বাড়ি বাড়ি গিয়ে টাকা তুললাম সে সব কেমন করে যেন কর্পূরের মতো উবে গেল। হতে গোনা অল্প কিছু মানুষ অপপ্রচার ছাড়ালেন।

এই কলেজ থেকে পাস করলে তাদের সার্টিফিকেটের কোন মূল্য থাকবে না। খ্রিস্টানদের টাকায় এই কলেজ হচ্ছে। কলেজের জমি নাকি মসজিদের! কেউ কেউ বলতে লাগলেন এই কলেজ কোন দিন সারকারি অনুমতি পাবে না। সরকরি অনুমতি পেলে তারা চুডি পড়ে ঘুরবেন, কেউ শাড়ি পড়ে ঘরে বসে থাকার কথা ঘোষণা করলেন। সবচেয়ে ভয়ংকর প্রচারণা চালালেন আমাকে নিয়ে। পরস্পর বিপরীতমুখী এক দ্বান্দ্বিক প্রচারণা ছড়ালেন আমাকে নিয়ে।এক দল প্রচার করা শুরু করলেন আমি নাস্তিক, ধর্মকর্ম মানি না তারা মসজিদ আর চা স্টলগুলো দখল করে থাকলেন। আরেকদল প্রচার করলেন আমরা নাকি জঙ্গি, গভীর রাতে আমাদের কলেজে জঙ্গিদের ট্রেনিং দেয়া হয়।আমরা নাকি স্বাধীনতা বিরোধী। তারা শুধু প্রচার করেই ক্ষান্ত হলেন না । থানায় গিয়ে অভিযোগ পর্যন্ত করলেন। একদিন পুলিশ আসলো তদন্ত করতে। এতে আমাদের সুবিধে হলো। তারা তদন্ত করে কিছু পেলেন না।মাঝখান থেকে ২/১ জন শিক্ষার্থী পেলাম। তারা কলেজ থেকে পাস করল এবং তারা এখন অনার্সে পড়ছে।

আজকে আমরা কারিগরি শাখার পাঠদানের চিঠি পেলাম।পেলাম কলেজের কোড নম্বর- ৫৪২৯৩ । এখন থেকে আর অন্য কলেজের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হবে না। আমাদের কলেজের মাধ্যমেই এখন শিক্ষার্থীরা নিবন্ধিত হতে পারবে। ৫ বছর অপেক্ষার পর আমরা এই স্বীকৃতিটা পেলাম। এই স্বীকৃতির মাধ্যমে প্রমাণ হলো – যা স্বপ্নে দেখা যায় তা বাস্তবেও করা যায়। প্রমাণ হলো ১০ জনে মিলে কাজ করলে অসম্ভ বলে কিছু নেই। গণমানুষই আসল শক্তি।

আজকের এই দিনে আমি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি সেই সব মানুষদের যারা আমাদের স্বপ্নকে উসকে দিয়েছিলেন। যারা নানা ভাবে আমাদের পাশে থেকেছেন । কিছু মানুষের নাম না নিলে অন্যায় হয়ে যাবে। অর্জুনা গ্রামের হাজি বাড়ির মানুষদের কথা যারা জমি দিয়েছিলেন এই কলেজের জন্য, নিরক্ষর কালু চাচার কথা যিনি ৮৫ ডিসিমেল জমি দিয়েছিলেন কলেজের জন্য।অর্জুনা অন্বেষা পাঠাগারের সদস্যবৃন্দ, গ্রামের যুবসমাজ, সাধারণ মানুষ যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন এই কলেজের জন্য । আমি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি বিথী আপা, রিনা আপা, আশিক আর নাজমুলকে যারা বিনা পারিশ্রমিকে বছরের পর বছর শিক্ষকতা করে যাচ্ছেন এই কলেজের জন্য।আমি স্মরণ করছি সাদিক ভাইকে । যার সেই প্রাথমিক ৪০ হাজার টাকা না পেলে কলেজ দেয়ার স্বপ্নটা অকালেই ঝড়ে যেত। আমি স্মরণ করছি পড়শি ফাউন্ডেশনকে যারা একটা কম্পিউটার ল্যাব করে দিয়েছে , স্মরণ করছি মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনকে যারা নান সময় আমাদের কলেজের পাশে দাঁড়িয়েছে, স্মরণ করছি মেরাজ ভাই, বেণু দি, আর ফেরদৌসী আপাকে যারা ঢাকা থেকে প্রায় শতাধিক প্রজাতির গাছ এনে লাগিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের কলেজে। স্মরণ করছি নাজমুল স্যারকে, সময়ে অসময়ে যার কাছে টাকা চেয়ে নিরাশ হতে হয় নি। স্মরণ করছি কানাডা প্রবাসী জিন্না ভাইকে, অস্টেলিয়া প্রবাসী শাহরিয়ার ভাইকে। এমনও অনেক লোক টাকা দিয়েছেন যারা নাম প্রাকাশ করতে চাননি। তাদেরকেও স্মরণ করছি আজকের এই শুভ ক্ষণে।

আমরা স্মরণ করছি নিম্ন লিখিত ব্যাক্তিবর্গ ও সংগঠনকে যাদের সহযোগিতার কারণেই এই কলেজ ।

যাদের সহযোগিতায় আমাদের এই কলেজ
১. গ্রামবাসী ৪৪৩০
২. নির্মল চন্দ্র গোপ ১০,০০০
৩. ছরোয়ার ভাই — ১০,০০০
৪. শাহরিয়ার ভাই – ১,১০,০০০
৫. সাদিক ভাই – ১২,০০০
৬. খালিদুর – ৭০০০
৭. বেণু আপা – ৫০০
৮. স্বর্ণা – ১০০০
৯. দোলন দিদি – ১০০০
১০. কিরণ দা – ১০০০
১১. সোহান – ৫০০
১২. রেজা ভাই – ২০,০০০
১৩. সেলু বাছেদ – ১৬০০০
১৪. জাহিদ – ৫০০
১৫. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক – ১২,০০০
১৬. সাগর – ৫০০
১৭ ৫০০
১৮. শাহেদ – ৫০০
১৯. সুমন – ৫০০
২০. অণিক – ৫০০
২১. গোলপ ভাই – ২,৫০০
২২. ডা: রনি ভাই – ২৫,০০০
২৩. মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন – ৭৫,০০০
২৪. গণি ভাই – ২০০০
২৫, কাজী জহুরুল – ৫০০০
২৬. বেলায়েত – ৫০০
২৭. সোহেল ভাই – ৬০০০
২৮. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক – ৩৪৫
২৯. মেরাজ ভাই – ২০০০
৩০. তুষ্টি ভাই – ২৩,০০০
৩১. হোপ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন – ৩৯,১৬৬
৩২. নাজমুল হক স্যার – ১৯,০০০
৩৩. রায়না মতিন – ৯০০০
৩৪. জায়েদ ফরিদ – ৫০০০
৩৫. শারাফাত জামিল – ৩০০
৩৬. নাসির উদ্দিন – ১০০০
৩৭. এ্যামিক্যাবল – ১০০০
৩৮. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক – ৫০০০
৩৯. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক – ৭০০
৪০. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক – ১০০০
৪১. দেলোয়ার – ১০০০
৪২. মানিক মাহমুদ – ৮০০০
৪৩. মনোয়ার ভাই – ১৫,০০০
৪৪. টিটু – ৪০০০
৪৫. কাজলের মা – ১,৪০০
৪৬. শেখ বাহাদুর লিটু – ১০,০০০
৪৭. হাজী গোলাম শাহার আলী (বাদল) – ৫,০০০
৪৮. আমিরুল ইসলাম – ১২,০০০
৪৯. দ্বীপেন ভট্টাচার্য – ১০,০০০
৫০. শাহাদৎ – ১১,০০০
৫১. মাছুদ – ৩০০০
৫২. কম্পিউটার ল্যাব – ২৬,০০০
৫৩. ছাত্র-ছাত্রী থেকে – ১,৫০০
৫৪. হোসেন – ৫০,০০০
৫৫. শফিকুল ইসলাম – ৭০,০০০
৫৬. এম এস ডি ফাউন্ডেশন- ১,৩৯৮
৫৭. শাহজাহান সাজু – ৪০০
৫৮. ছালাম ৬০০

লোন করা হয়েছে যাদের নিকট হতে :
১. সাদিক ভাই – ৪০, ০০০
২. রিপন ভাই – ৩০,০০০
৩. কাজলের মা – ৪০,০০০ ( পরিশোধ)
৪. সোলায়মান – ৪০,০০০
৫. মিঠু – ৪০,০০০
৬. কৃষক সমিতি – ৫০,০০০
৭. আবদুস ছাত্তার খান – ২৫, ৯০০
৮. হাসান – ৬৪০০
৯. মাছুম – ১২,০০০
১০. রুবেল – ১৩,০০০
১১. আলী আবকর – ৩৩০০০
১২. কাবেল -৫০০০
১৩. জাহিদ ভাই – ১০,০০০/=
১৪. মৃত হবিবুর রহমানের স্ত্রী – ২২০০০/=
১৫. হাসু ভাইয়ের বউ – ২০,০০০/=
জমি দাতা
১. হাজী ইসমাইল খাঁ ৭৬ ডিসিমেল
২. কালু চাচা -৮৬ ডিসিমেল

কোন স্বপ্নই বৃথা যায় না।যে স্বপ্ন নিয়ে আজ থেকে প্রায় অর্ধশতাব্দি বছর আগে যে রক্তগঙ্গা পেরিয়ে এই দেশ স্বাধীন হয়েছিল। যে লাখ লাখ শহীদের লহুতে উর্বর হয়েছিলো এই দেশের জমিন , সেই জমিনেই পুষ্পিত হবে নানান প্রজাতির ফুল। নানান চিন্তায়-চেতনায়, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়বে এই রক্তাপ্লূত ভূমির ভূমিজ সন্তানেরা । আর তাদের বিকাশের ক্ষেত্র তৈরি করতেই আমাদের এই কলেজ।
জয় আমাদের হবেই

আপনার মতামত লিখুন :