গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন’র অতীত – বর্তমান – ভবিষ্যৎ

এক মিনিটের বেশি নয়

সমাবেত সুধী,
কোন সুনিদির্ষ্ট কর্মপরিকল্পনা, কিংবা উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু হয়নি গ্রাম পাঠাগার আন্দোলান। দীর্ঘ ৭ বছরের পথচলায় নানা সমস্যার সে হয়েছে মুখোমুছি। অভিযোজনের জন্য তৈরি করেছে নানা কর্মপদ্ধতি।অভিজ্ঞতা থেকে সে তৈরি করে নিয়েছে তার আগামীর পথচলা।এই দীর্ঘ পথচলায় সে যেমন পেয়েছে নানা সারথী, তেমনি পেয়েছে নানা বিরোধীপক্ষ।কেউ যেমন এসেছে সাহায্য করতে আবার কালা পাহারের মতো কেউ এসছে পথে প্রতিবন্ধকতা করতে। সবই সে অতিক্রম করেছে চরম ধৈর্য্যের সাথে।
আজ আমাদের কাছে স্পষ্ট গ্রামের উন্নয়ন না হলে দেশের উন্নয়ন হবে না। কিন্তু অন্ত্যন্ত পরিতাপের সাখে আমারা লক্ষ্য করছি সেই ব্রিটিশ আমাল থেকেই গ্রামকে শোষন করে, গ্রামকে অন্ধকারে রেখে নগর গড়ে তুলার একের পর এক কর্মকাণ্ড হাতে নেয়া হয়েছে। আজ বাংলাদেশেও তার কোন পরিবর্তন আমারা দেখছি না।
অখচ এই কৃষক, কামার, জেলে, তাতীরাই একদিন বন্ধুক হাতে নিয়েছিলো যুদ্ধ করেছিলো,বিদেশী বেনিয়াদের এই দেশ থেকে তাড়িয়েছিলো, বুকে তাদের স্বপ্ন ছিলো একটি সুখি সমৃদ্ধির বাংলাদেশ, দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের কিন্তু তারা আজ চরম হতাশার সাথে লক্ষ্য করছে এই দেশেরই এক শ্রেনীর মানুষ তাদের শোষণ করছে, তাদের স্বর্বশান্ত করছে।
সমবেত সূধী, আপনারা কি বলতে পারবেন বাংলাদেশের কোন গ্রামে , কিংবা মফস্বল শহরে ভালো কোন হসপিটাল আছে? আছে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান? না নেই। কিন্তু ব্যাঙ্গের ছাতার মতো আছে এনজিও, আছে কিন্ডারগার্টেন, কোচিং সেন্টার, আর প্রাইভেট ক্লিনিক। যারা ক্ষুদ্র ঋণের নাম করে এদেশের গ্রামকে শোণষ করে নিচ্ছে সেই সুদখোর  মহাজনদের মতোই।যারা সরকারি সেবাদানকারী সংগঠণগুলোকে নষ্ট করে দিচ্ছে সুচতুর ভাবে।
তাই গ্রাম শোষণ করার এই নানা মুখি অপতৎপরতাকে স্তব্দ করে দেয়ার জন্য, পরিবেশ আর প্রকৃতিকে তার স্ব-অবস্থানে রাখার জন্য, গ্রামকে সমস্ত প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কার্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার জন্য ২০০৬ সাল থেকে আমার শুরু করেছি গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন।
গ্রাম পাঠাগার আন্দোরনের অতীত (২০০৬ – ২০১৩):
ক) এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত পাঠাগারের সংখ্যা হলো ২২ টি
১. অর্জুনা অন্বেষা পাঠাগার, অর্জুনা ভূঞাপুর, টাংগাইল ২. অরং পাঠাগার , খাগড়াছড়ি ৩. কাজী মোতাহরে হোসেন পাঠাগার, খোকসা, কুষ্টিয়া ৪. জ্ঞানদীপ পাঠাগার, শাহারাস্তি , চাঁদপুর ৫. কবি গোলাম মোস্তফা পাঠাগার, হরিণাকুন্ডু, ঝিনাইদহ ৬. জননী আলেয়া পাঠাগার, নাটোর ৭. সারুটিয়া সাধারণ গ্রন্থাগার, টাংগাইল ৮. লাইসিয়াম গণিত ও বিজ্ঞান সংঘ, ভূঞাপুর, টাংগাইল ৯. গারোবাজার পাঠাগার, মধুপুর , টাংগাইল ১০. পাহারপুর বৌদ্ধবিহার পাঠাগার, বদলগাছি, নওগাঁ ১১. নালন্দা ডিজিটাল পাঠাগার, শাহীনবাগ, ঢাকা ১২. মহানন্দপুর পাঠাগার, মহানন্দপুর, সখিপুর, টাংগাইল ১৩. কুতুবপুর সাধারণ পাঠাগার, কুতুবপুর, সখিপুর, টাংগাইল ১৪. মুক্তির দিশারী পাঠাগার, জিতাশ্বরী,বড় চাওনা, সখিপুর , টাংগাইল ১৫. শান্তি সংঘ গণ পাঠাগার, চারিবাইদা, কুতুবপুর, সখিপুর, টাংগাইল ১৬. প্রগতি পাঠশালা, রামনগর, গাংনী, মেহেরপুর ১৭. আমাদের পাঠাগার, সিকিরচর, ছেংগারচর, পৌরসভা, মতলব উত্তর, চাঁদপুর ১৮. আমবাড়িয়া গণপাঠাগার, আমবাড়িয়া, খোকশা, কুষ্টিয়া ১৯ . শানোকবয়ড়া অণুসন্ধান পাঠাগার , ফলদা, ভূঞাপুর, টাংগাইল ২০. জ্ঞান বিতান পাঠাগার , অর্জুনা বাজার, ভূঞাপুর, টাংগাইল ২১. ইছাপুর আদর্শ পাঠাগার, ইছাপুর, চৌগাছা, যশোর,
২২. পাড়া কুশারিয়া গণগ্রন্থাগার, সন্ধানপুর, ঘাটাইল, টাংগাইল
২৩. রাপ্রু স্মৃতি পাঠাগার, রাজ্যমণি পাড়া খাগড়াছড়ি
২৪. আনন্দোময়ী পাঠাগার, ফরিদপুর
২৫. ড: আবুল বারাকাত পাঠাগার, কান্দি প্রসাদপুর,চৌরস্তা,গফরগাঁও, ময়মনসিংহ
খ) হাতেম খাঁ যাত্রীছাউনী নির্মাণ
গ) অর্জুনা অন্বেষা পাঠাগারের উদ্যোগে গত ৭ বছর ধরে অর্জুনা বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
ঘ) বন্যা, সিডর, শীত নানা সময়ে মানুষের পাশে দাড়াচ্ছে গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন
ঙ) মেহেরপুরের গাংনীতে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ নিরাময় ক্লাসের আয়োজন করেছে গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন।
চ) লাইসিয়াম গণিত ও বিজ্ঞান সংঘের উদ্যোগে গণিত উৎসব, বিজ্ঞানমেলা, জ্যোতির্বিজ্ঞান উৎসব , ইত্যাদি নানা ধরণের অনুষ্ঠাণের আযোজন ছিলো গত কয়েক বছর ধরেই
ছ) বোসন নামে একটি ত্রৈমাসিক বিজ্ঞান পত্রিকা প্রকাশ, যা ২টি সংখ্যা বের করার পর আপাদতো বন্ধ আছে।
 গ্রাম পাঠাগার আন্দোলনের বর্তমান :
বর্তমানে গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে
ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে।সমমনা বন্ধু সংঘঠনের সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধির চেষ্টা করছে।
আগামী মাসের ৬ তারিখে ভূঞাপুরে গণিত উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে।
আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: (২০১৩-২০২৬)
আমাদের পরিকল্পনাকে আমারা তিনটি ভাগে ভাগ করেছি
১ স্বল্প মেয়াদী : ২০১৩ – ২০১৫
ক) ২০১৩ সালে ৭টি বিভাগের জন্য ৭জন প্রতিনিধি নিবার্চন। যারা ঐ সমস্ত বিভাগ ব্যাপকভাবে ঘুড়বে।এবং তাদের পরামর্শক্রমে ২০১৫ সালের মধ্যে প্রতিটি জেলার কোন না কোন গ্রামে একটি করে পাঠাগার স্থাপন করা হবে।
খ) শিশু, কিশোর এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বিভিন্ন ধরণের প্রকাশনা কার্যক্রম পরিচালনা করা। আগামি মাস থেকেই আমারা প্রকাশ করতে যাচ্ছি – অতন্দ্র নামের একটি মাসিক পত্রিকা
গ) সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য ভ্রাম্যমান একটি সাংস্কৃতিক দল গঠন করা –  যারা বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে গিয়ে নাটক, কবিতা আবৃত্তি, গান ইত্যাদির মাধ্যমে গ্রাম পাঠাগার আন্দোলনরে প্রয়োজনীয়তা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিকাশ, অসাম্প্রদায়িক, বিজ্ঞানমনস্ক, মানবিক সমাজ বিনির্মাণের জন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করবে।
ঘ) গ্রাম পাঠাগার আন্দোলনকে দ্রুত প্রসার ঘটানোর জন্য এবং শিক্ষা ব্যবস্থ্যার আমূল পরিবর্তন ঘটানোর জন্য রবীন্দ্রনাথ এবং গান্ধিজীর শিক্ষা দর্শনের উপর ভিত্তি করে টাংগাইলের অর্জুনাতে ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত করা হবে একটি কলেজ। যার জন্য ইতোমধ্যে ৭৭ ডিসিমেল জমি অধিগ্রহণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে শিশুশিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চতর শিক্ষাবিস্তারে কাজ করবে। গ্রামের মানুষদেরকে নানা ধরণের প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে তাদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি এবং দক্ষ মানব সম্পদে পরিণত করবে।
ঙ) যে সমস্ত পাঠাগারগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাদের কার্যক্রম সুষ্ঠভাবে পরিচালনার জন্য তাদের চাহিদা অনুযায়ী নানা ধরণের সাহায্য সহযোগিতা করা।
২. মধ্য মেয়াদী পরিকল্পনা : (২০১৩ – ২০২০)
ক) বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া, দূর্গম এলাকা যেমন হাওয়ড়, চরাঞ্চল, সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকা, পাবর্ত্যাঞ্চল ইত্যাদি যে সমস্ত এলাকায় ৭-১০ বর্গকিলোমিটার এরাকার মধ্যে কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই সেইখানে স্কুল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন পরিচালনা করা।
খ) প্রতিটি উপজেলার কোন না কোন গ্রামে একটি করে পাঠাগার স্থাপন করা।
গ) দূর্গম এলাকাগুরোতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিস্তারের জন্য এলাকার জনগনকে সংগঠিত করে টেকশই স্থাপত্য নির্মাণ।যেমন যমুনার চর এরাকার জন্য লোহার ভাসমান স্থাপনা নির্মাণ করা যেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠাণ, হাসপাতাল থাকবে। প্রয়োজনে রাজনৈতিক দল ও সরকারের উপর চাপ প্রয়োগের কৌশল অবলম্বন।
ঘ) গ্রামের মানুষদের সংগঠিত করে সমবায়ের মাধ্যমে কৃষি, মৎস্যচাষ, হাসমুরগিপালন ইত্যাদির জন্য জনগণকে উদ্বুদ্দ করা।
দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা : (২০১৩ – ২০২৬)
ক) ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিটি ইউনিয়নে অন্তত একটি করে পাঠাগার স্থাপন।
খ) জনগনকে দক্ষ মানব সম্পদে পরিণত করার জন্য সারা দেশে ১০০টি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠাণ গড়ে তুলা।
গ) দেশের সমস্ত অর্থনৈতিক, প্রসাসনিক কার্যক্রমের কেন্দ্র বিন্দু হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদকে শক্তিশালি করা।
আপাদত এই হলো আমাদের অতীত – বর্তমান- ভবিষৎ নিয়ে একটি লেখচিত্র। আপনাদের সাহায্য, সহযোগিতা ও পরামর্শের ভিত্তিতে এই লেখচিত্রটিকে আরো সংযোজন, বিয়োজনের মাধ্যমে আরো টিকসই , যুগোপযোগি করে জনগনকে উদ্বুদ্ধ করে, জনগনকে দিয়ে, জনগনের অর্থে গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন গড়ে তুলতে চায় আত্মনির্ভরশীল, সমৃদ্ধশালী এক একটি গ্রাম।গড়ে তুলবে আগামী প্রজন্মের নিরাপদ বাংলাদেশ।
সমাবেত সূধী, আপনাদের আবারো ধন্যবাদ জানিয়ে আমি আমার বক্তব্য শেষ করছি।
আবদুস ছাত্তার খান