একদিন শালিয়াবহ গ্রামে

এক মিনিটের বেশি নয়

এইবার ১লা বৈশাখে গিয়েছিলাম লাল পাহাড়ের দেশে। চালা-বাইদে বিভক্ত গ্রাম শালিয়াবহ । গারোবাজারের কাছেই এই গ্রাম। ক্ষুদ্র কয়েকটি নৃগোষ্ঠির বাস এই গ্রামে। তবে মুসলমান বাঙ্গালীর সংখ্যই অধিক। এই গ্রামের এক চাষা আবদুল আজিজ। তিনি গত ১৩ বছর ধরে এই দিনে কৃষক মেলার আয়োজন করে থাকেন। আশেপাশের ১০/১২ গ্রাম থেকে আসে চাষী আর চাষী বউরা। আসে তাদের ছেলেমেয়েরা।নানান রংয়ের পোশাক পরে। আসে হরেক রকমের দোকানীরা তাদের পসরা নিয়ে।

আমি যখন পেচার আটা তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। লোকজনকে বললেই চিনে ফেলল। তারা এই মেলার নাম দিয়েছে কোস্পানির মেলা। গ্রামীণ মেঠো পথ। রাত্রী হয়ে আসছে বলে কেউ রাজি হচ্ছে না। একজনকে দ্বিগুন ভাড়া দিয়ে রাজি করালাম। রহিম চাচার ভ্যান যখন শালিয়াবহ বাইদে তখন পুব আকাশে চাঁদ উঠেছে বিশাল। বাইদ মানে নিচুঁ জায়গা। সেখানে বর্ষায় পানি থাকে। এখন বুরো ধানের চাষ হচ্চে। আশে পাশের ঝোপঝাড় থেকে নানা জাতের পাখির শব্দ। মাঝে মাঝে শাল গাছের বন চোখে পড়লেও তারা সংখ্যা লঘু। উড়ে এসে জুড়ে বসেছে বিদেশী জাতের গাছ।

রাত্রি ৮টা সময় পৌছঁলাম আজিজ ভাইয়ের ভিটায়। এখানেই বসবে মেলা। লোকজন ব্যস্ত রান্না বান্না নিয়ে। কথা হয় অনেকের সাথে। কবে থেকে শুরু হয়েছে মেলা। পরিচয় হয় সুরুজ ভাইয়ের সঙ্গে। বলল সকাল হলেই টের পাবন কতো লোক আসে। কতো রকমের দোকান বসবে। আসবে নানান বয়সের মাসুষ। সকাল থেকেই অতিথীদের খাওয়ানো হবে পান্তা ভাত। দুপুর তেকে খিচুরী। প্রায় এক লক্ষ লেকের আয়োজন। আর যাবার বেলায় প্রত্যেকের হাতে তুলে দিবে একটি করে ফলের গাছ। আমি অবাক হয়ে শুনছি তাদের কথা।

রাত্রে ঢোলের বাড়ি শুনতে পেলাম। বলল মান্দী পাড়া সং হচ্চে। তারই শব্দ। যাওয়ার খুব ইচ্ছে হলো কিন্তু দেহঘড়ি ততক্ষনে নড়বড়ে হয়ে গেছে। সজনের ডাল খেয়ে আমি ঘুমাতে গেলাম আজিজ ভাইয়ের মাটির ঘড়ে। আহ কি শান্তি।

ভোর হতেই ঘুম ভেঙ্গে গেল। হাটতে বেরিয়ে পড়লাম। রাত্রে টের পাইনি। সকালে বুঝতে পারলাম কী সৌন্দর্য্য গ্রামটার। রাস্তার দুইপাশে হাতিসূর, বাটফুল, নটে মৌ, নানান জাতের হাছ। বাইদে সবুজ ধান। চোখ জুড়িয়ে যায়। মনের ভিতর গুনগুন করে উঠে গান।

আজিজ ভাইয়ের ভিটায় ফিরে এসই দেখি লোকজন আসতে শুরু করেছে।আমি একটা থালা নিয়ে লাইনে দাড়িয়ে যাই । পান্তা ভাতের জন্য। কিছুক্ষনের মধ্যে দেখলাম ঢোল বাঝাতে বাঝাতে গুঙ্গুর পায়ে আসল মজিদ লাঠিয়ালের দল। দেখাল লাঠির নানা খেলা। অদ্ভুত শাররীক কসরত।৬০ বছরের বেশি বয়স হবে জমির চাচার । নাকের কাছে একটা কাটা দাগ। সেও দেখালো খেলা। দম নিতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু হারবার পাত্র নয়। মাঝে মাঝে বসে শ্বাস নিচ্চে। কপালে গ্লাস রেখে শুয়ে থেকে উঠে দাড়ালেন্ আবার শুয়ে দেখালেন্। সব দর্শক দাড়িয়ে ছালাম জানালেন তাকেঁ।উনিতো পেশাদার বাজিকর নন । একজন কৃষক শিল্পি।চৈত্রের অলস দুপুরে এইসব ক্রিয়া কৌসলই তাদের দিয়ে থাকে নির্মল আনন্দ। জীবনের কতো কিছু যে শেখার আছে এদের কাছ থেকে।

বরতে লজ্বা লাগছে আমি আগে কথনো সরাসরি জারি শুনিনি। আজ দেখলাম ও শুনলাম। কী অদ্ভুত পরিবেশনা। মাঝে একজন লোক ছিল্কি বলছে আর তাকে ঘিরে গোল হয়ে ১০/১৫ জন সেটার পুনরাবৃত্তি করেছে। কী তাদের গতি। লুঙ্গির দুই কোণায় ধরে বিশেষ ভাবে তাদের এই নৃত্য।নাটকের একটা ঢং আছে এতে। শুনলাম ধয়া গান। পুখি পাঠ। দুই গারো মেয়ের নৃত্য।ছিলো পান্তা ভাত খাওয়ার প্রতিযোগিতা।

মেলায় বসেছে নানান রকমের দোকান। চিনিসাধের ঘোড়া, পতুল, হাতি চিনি দিয়ে বানানো সব। বসেছে মাটির তৈরি জিনিসপত্র।তরমুজের দোকান, নানান গৃহর্স্থ্য সামগ্রি। যেটা উল্লেখ করার মতো বিষয় সেটা হলো এই সমস্ত মেলায় অনিবার্যভাবে যেটা থাকে সেটা হলো জুয়ার আসর এই মলোয় তাও নেই।। কঠিন নিষেধ আছে আজিজ ভাইয়ের। তার কর্মীরাও এই ব্যাপারে বেজায় সজাগ।

আমাদের ইচ্ছে ছিলো এখানে একটা কৃষি পাটাগার দিতে।আমি গিয়েছিলাম কিছু কৃষি বিষয়ক বই নিয়ে পাঠাগারটা শুরু করে দিতে। । নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশিদকে দিয়ে উদ্ভোধন করা হয় এই পাঠাগারের।

আমরা শুরু করলাম। এইবার পানাদের পালা। এখন দরকার বই রাখার তাক, আরো অনেক বই। সকলের অংশগ্রহনেই সম্ভব এই পাঠাগারকে সমৃদ্ধশালি করে গড়ে তুলতে।

ফিরবার পথে দেখা হয় বাল্য বন্ধু অধরার সাথে। আমার কৈশরের খেলার সাথী। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে ২০ বছর আগের পৌসের কোন বিকেলের দৃশ্য । আমি আর অধরা হাত ধরে হলুদ সরষে ক্ষেতের আইল ধরে হাটছি।হাত বুলাছি নরম সরষের ফুলে।মধুপুর থেকে গাড়ি চলছে সাই সাই করে সাথে সাথে চলছে বৈশাখের চাঁদ। আর আমার নষ্টালজিয়া।