আমরাই বাংলাদেশ

88 জন পড়েছে

এক মিনিটের বেশি নয়

সাত সকালে আমি যখন কুয়াশার চাদর ভেদ করে প্রায় ৩০ কি.মি পথ অতিক্রম করে ঘাটাইলের প্রাণকেন্দ্র চেতনা ৭১ এর পাদদেশে তখনও অভি এসে পৌঁছেনি। জগন্নাথ থেকে বাংলায় অনার্স ,মাসটার্স শেষ করে বেকারের খাতায় নাম দিবো দিবো করছে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা বাবার আশির্বাদে এখন আপাদতো ঐ টেনশন তার নেই। ফলে যুক্ত হয়েছে গ্রাম পাঠাগার আন্দোলনে। কেমনে কেমনে যেন লিংক করেছে দড়িপাড়া –রামকৃষ্ণপুর গ্রামের আপনের সাথে। তারা সেখানে একটি পাঠাগার স্থাপন করেছে। তারই উদ্বোধন করতে যেতে হবে আমাদের।

আমার মামুর দেশ ঘাটাইল । অভির আসতে দেরি হওয়ায় হানা দেই মামাদের বাসায়।উদর পূজা সেরে যখন অভির ফোন পেয়ে মামার বাসা থেকে বের হয়ে আসছি তখন দেখি মামিজান আমার হাতের মুঠোয় কিছু একটা গুজেঁ দিলেন। ( গোপনে বলি ৫০০ টাকা) । তখন আমার চেয়ে কয়েক ফুট লম্বা বেক্কল অভিটার উপর একটু খুশিই হলাম। ও ঠিকমতো আসলে এই টাকা আর খাওয়াটা হতো না।

 

২৫ মাইল নেমে চা পানের বিরতি দিলাম। মনে হলো পাখি আপার বাড়ি তো এখানেই কোথাও। অভিরে বললাম ফোন লাগা। ১০ মিনিটের মধ্যেই আমাদের পাখি আপা এসে হাজির। বললাম যাবেন নাকি। বলে ‘ আবার জিগায়’ বুঝলাম একে নাচুনী বুড়ি তার উপর ঢোলের বাড়ি।

মান্দিদের বাড়িঘড় ছাড়িয়ে, জলছত্র, পচিঁশ মাইল, গাছাবাড়ি, দোখলা , চুনিয়া, পেরিয়ে আমরা যখন পীরগাছার মোড়ে এসে নামলাম, বেলা তখন বেশ হয়েছে। মধুপুর বনের সুবাতাসে ফুসফুস ভরে উঠলেও দেহের সিএনজির সাথে লাগানো অংশটা বিদ্রোহ করে উঠেছে ততক্ষণে। এর সাথে আরো একটা জিনিস বুঝলাম আমরা তিনজনই নবাগত।মানে কেউই রাস্তা চিনি না। বিষয়টা যে শুধু আমরা বুঝলা তা না। মোড়ে দাড়িয়ে থাকা ২/৩টা মোটর ব্যান চালক চাচারাও বুঝে ফেলেছেন।ফলে দাম হাকাচ্ছেন কয়েকগুন।
যাক দরদাম মিটিয়ে আমরা উঠে বসলাম ভ্যানে। ভ্রমণের জন্য ব্যান একটা উত্তম বাহন। যার প্রায় সবদিকই খোলা।

কিছুদূর গিয়েই দেখতে পেলাম একটি হাসপাতাল। সাইনবোর্ড না থাকলে আমরা বুঝতেই পারতাম না এটা একটা হাসপাতাল।ডা: এড্রিক এস বেকার হাসপাতালটি স্থাপন করেছেন।বিদেশ ভিভূই থেকে তিনি বাংলাদেশের এই প্রত্যান্ত এলাকার মানুষের চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন। কিছুদিন আগে এই মহৎপ্রাণ মানুষটি চলে গেলেন এই পৃথিবী থেকে। কতো সাধারণ ছিলো তার জীবনযাত্রা।কতো সাধারণ তার সমাধীসৌধ। এর কথা ভেবে আমাদের ডাক্টারদের কথা, হাসপাতালের কথা মনে পড়ে গেল।কতো তফাৎ

 

বেলা যখন ঠিক মাথার উপরে তখন আমরা পৌছঁলাম দড়িপাড়া রামকৃষ্ণপুর বাজারে।দু’গায়ের মাঝামাঝি এই বাজার বলে বাজারের নামও রাখা হয়েছে দু’টি গ্রামের নাম মিলিয়ে। এই বাজারেই একটা ঘর ছিলো বণিক সমিতির। সেখানে বসে তারা টিভি দেখে। গ্রামের তরুণেরা যখন বণিক সমিতির সভাপতিকে গিয়ে ধরেন আমাদের ঘরটা দিতে হবে। আমরা পাঠাগার দিবো। তারা ততক্ষণে বুঝতে পারি নি। যারা টাস খেলে, ইভটিচিং করে, আরো নানা কাজ করে টাইম পাস কের তারা করবে পাঠাগার। তরুনেরাও নাছোড়বান্দা। তারাও অনুরোধ করতে থাকে। ফলে মুরুব্বিরাও বলে যাও- ‘তোমরা যদি পাঠাগার দেও তবে আমরা তোমাদের কাছ থেকে কোন ভাড়া নিবো না’। পরে তারা লেগে যায় বই সংগ্রহের কাজে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েল সেলু বাসিত স্যার, অভির নিজের কিছু বই, ঢাকার বন্ধু ভার এক ভাই , গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন, এরকম আরো কিছু বন্ধু বান্ধব, শুভাকাঙ্খিরা গোটা পঞ্চাশেকের মতো বই দেন এই পাঠাগারকে। গ্রামের যাদের কাছে বই ছিলো তারাও কেউ কেউ বই দেন এই নতুন পাঠাগারকে। এই ভাবেই গড়ে উঠল গ্রাম পাঠাগার আন্দোলনের ৩৭ তম সংগঠন ‘ দড়িপাড়া-রামকৃষ্ণপুর গণ গ্রন্থাগার’।

গ্রামের বেশির ভাগ মানুষের ঘর মাটির তৈরি।চালটা চিনের। রাস্তাগুলো এখনো মেঠোপথ।সহজেই চোখে পড়ে গরুর গড়ি।অতিথী এখনো এদের ঘরে নারায়ণ।আশেক মাহমুদ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া লিমন ভাইয়ের বাড়িতে খেতে যাই আমরা। তার ভাবি আর বোনারে আপ্যায়নের কথা মনে থাকবে অনেকদিন।গ্রামের মানুষের ব্যবহার মুগ্ধ করার মতো।
আজকের এই পাঠাগার উদ্ভোধন করতে ঘাটাইল থেকে এসেছে অভি, ধনবাড়ি থেকে মারুফ, পচিঁশ মাইল (মধুপুর) থেকে সুবর্ণা পাখি। জামালপুর-ময়মনসিংহ থেকে এসেছে দড়িপাড়া –রামকৃষ্ণপুর গ্রামের শিক্ষার্থীরা। একটা পাঠাগারের জন্য একত্রিত হয়েছি আমারা। অনেকেই আমাদের প্রজন্মকে ইভটিজার, নেশাখোর,আরো নানা বিশেষণে বিশেষিত করে থাকেন। আমি সবিনয়ে আপনাদের বলতে চাই আপনাদের পথপ্রদর্শক ছিলেন গান্ধী, বঙ্গবন্ধু, ভাসানী, আর আমাদের কে

আছেন ? বন্ধুরা আমাদের পথ আমাদেরই তৈরি করতে হবে। কে কি বলল সেটা বড় কথা নয়, আমরা কি করছি সেটাই বড় কথা।মনে রাখবেন আপনারাই নতুন বাংলাদেশ।

আমরা যখন ফিরছি তখন সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিম আকাশে। দড়িপাড়া বাইদের সবুজ ধানের মাঠের উপর ছড়াচ্ছে তার ম্লান আলো। যতদূর চোখ যায় শুধু ধান আর ধানের জমি।সারা দিনের ক্লান্তি অবসন্ন না করে চাঙ্গা করে তুলছে আমাদের মনকে। যে গ্রামে আগে কখনো আসি নি, যে মানুষদের সাথে আগে কখনো পরিচয় ছিলো না অথচ এই দুই /তিন ঘন্টায় তারা কতোটা আপন হয়ে গেলেন। মনে হয় কতোদিনের চেনা ।