আগুন পাখি

সেদিন গিয়েছিলাম রংপুরের শেখের পাড়া গ্রামে। যদিও সিটি কর্পোরেশনের ৩১ নং ওয়ার্ডের একটি গ্রাম। কিন্তু এখনো অবহেলিত।রাস্তা-ঘাট নেই বললেই চলে। কিন্তু সেই গ্রামে ছিলো এক স্বপ্নবাজ তরুণ রবিউল। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতীতে মাস্টার্স পাস করার পরের দিনই মারা যায় সমান্য এক অসুখে। তাঁর স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতেই আত্মীয় স্বজন, বন্ধু -বান্ধব মিলে স্থাপন করেছে রবিউল স্মৃতি সাহিত্য কেন্দ্র।

তাদের রয়েছে একটি পাঠাগার। বেগম রোকেয়া স্মৃতি পাঠাগারের রফিক ভাই বলেছিলেন পাঠাগারটি দেখতে যেতে । মর্ডান মোড় পার হয়ে ঘাগট নদী পেড়িয়ে আমরা যখন শেখের পাড়ার দিকে যাচ্ছি তখন রাস্তার দু পারে ফুটে থাকা বন টগরগুলো ( স্থানীয় লোকেরা কড়ি ফুল বলে) আমাদের স্বাগতম জানালো।উত্তর বঙ্গের রাস্তা-ঘাট , বন বাদড় সর্বত্রই এই ফুলের বারাবারি রকমের ছড়াছড়ি।সাদা বর্ণের – জোনাকির মতো ফুটে থাকা এই ফুলগুলো যে কোন পথিককে মুগ্ধ করবেই।সুকতানি , সিঁদলের মতো এই ফুলও উত্তর বঙ্গের ঐতিহ্যের মধ্যে পড়ে।বলছিলেন সঙ্গে থাকা বীর প্রতিক বদরুজ্জামান স্মৃতি পাঠাগারের মিজান স্যার । সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজার জন্য ফুলের চাহিদা এই ফুলই সিংহভাগ পূরণ করে থাকে।ভাওয়াইয়ার মতো আমিও নাকি এই ফুলের প্রেমে পড়েছি -বিশেষ এক লোকের অভিযোগ( তাহার নাম এখানে না নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।)

আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো তুহিন ভাই। সে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাতে মাস্টার্স করেছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক। আমাদের শুনাচ্ছিলেন তাদের উদ্যামের কথা , তাদের স্বপ্নের কথা । তাদের পাঠাগারে বই আছে মাত্র ৫০টি কিন্তু পাঠক আছে অনেক। বিশেষ করে মেয়ে পাঠকের সংখ্যাই বেশি। যেখানে সারা বাংলাদেশের পাঠাগারগুলো পাঠক সমস্যায় ভুগছে সেখানে এ তথ্য উৎসাহ ব্যঞ্জক। আমরা গিয়েও তার সত্যতা দেখতে পেলাম।সদ্য স্থাপন করা এক টিনের ঘরে বসে আছে তারা। কোন আসবাব তারা এখনো সংগ্রহ করতে পারেনি। মাদুর পেতে আমাদের অপেক্ষায় বসে আছে ১৬ জন মেয়ে আর ১৫ জন ছেলে । তারা সবাই বিভিন্ন স্কুল কলেজে লেখা পড়া করে।

স্থানীয় এক উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সংগঠনটির সভাপতি।তিনি বলছিলেন – অনেক কষ্ট করে তারা এই ঘরটি দিয়েছেন। এখন প্রয়োজন বই আর বই রাখার জন্য বুক শেলফ। বেশীর ভাগ সদস্যই তাঁর শিক্ষার্থী। এরা শুধু লেখা- পড়া নয় বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা নিয়েও কাজ করছে। মাদকের নেশায় তরুণ সমাজ যেন না মিশতে পারে সে দিকেও তারা নজর রাখছে।বাল্য বিবাহ প্রতিরোধেও তারা বিশেষ ভূমিকা রাখছে।

ফেরারা পথে একটা কবরস্থান দেখলাম। এই কবরগুলোর কোন একটাতে হয়তো রবিউল ঘুমিয়ে আছে। সেখানে ফুটে আছে অসংখ্য বন টগর। যারা জোনাকির মতো সারা দিনরাত এখানে ফুটে থাকে। রবিউল স্মৃতি সাহিত্য কেন্দ্র থেকে এই বন টগরের মতো অসংখ্য আগুন পাখি বেরিয়ে আসবে সেই প্রত্যাশায়ই রইলো । বিদায় রবিউল ।

আপনার মতামত লিখুন :