অর্জুনা অন্বেষা পাঠাগার ও বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা

48 জন পড়েছে

এক মিনিটের বেশি নয়

২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় অর্জুনা অন্বেষা পাঠগার। বাঙালির মহৎ অর্জনগুলোকে লালন করা এবং সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার প্রত্যয় নিয়ে যাত্রা শুরু করে এই পাঠাগার। প্রথমেই পাঠাগারকে দীর্ঘজীবী করার জন্য তারা কিছু সিদ্ধান্ত নেয়। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ঃ (ক) একবারের বেশি কেউ সভাপতি হতে পারবে না। (খ) সভাপতির অবশ্যই ছাত্রত্ব থাকতে হবে (গ) নেতৃত্ব নির্বাচন অবশ্যই গণতান্ত্রিকভাবে হতে হবে। (ঘ) কোন অনুষ্ঠান হলে এলাকার জনপ্রতিনিধিরা পদাধিকারবলে অতিথি নির্বাচিত হবেন। এরকম আরো কিছু সিদ্বান্ত তারা নেয়। এই সিদ্বান্তগুলো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তারা পাঠাগারে ভিতর ও বাহির থেকে নানা রকম বাধার স¤মুখীন হয়। ভিতরের বাধা হলো হীনম্মন্যতা যা বাঙালি হিসাবে হাজার বছর ধরে তার রক্তের ভিতরে লালন করে আসছে। অন্য লেখায় এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব। আজকে শুধু বাহিরের বাধা নিয়ে আলোচনা করব।

বাহিরের বাধাগুলোকে মোটামুটি তিনভাগে ভাগ করা যায় :

১. স্থানীয় নেতৃত্বের নেতৃত্ব হারানোর ভয় থেকে উৎসারিত বাধা

২. প্রশাসনিক বাধা

৩. রাজনৈতিক বাধা

প্রথমেই স্থানীয় নেতৃত্ব থেকে যে ধরনের বাধা আসে তা নিয়ে আলোচনা করব। গ্রামের নেতৃত্ব উঠে আসে কোনো না কোনো গোষ্ঠী বা বংশ থেকে (যেমন : তালুকদার, খান, ম-ল, মিঞা, সৈয়দ ইত্যাদি)। গোষ্ঠী প্রধান যা বলেন তাই তারা বেদ বাক্যের মতো পালন করেন। ন্যায়-অন্যায় বিচার করার বোধ তাদের থাকে না বা ইচ্ছা করেন না। বংশের ইজ্জ্বত রক্ষাই তখন তাদের একমাত্র ব্রত হয়ে দাঁড়ায়। যদি বংশের বেশির ভাগ লোক থাকে অশিক্ষিত তবেতো গোষ্ঠী প্রধানের পোয়াবারো। তিনি যা বলবেন তখন তাই আইন। যুগ যুগ ধরে স্থানীয় নেতৃত্ব এভাবেই কায়েম হয়ে আসছে। পাঠাগার যে ধরনের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাতে গোষ্ঠীপ্রধানরা মনে করেন তাদের নেতৃত্ব বুঝি যায় যায়। ফলে তারা বিরোধিতা করতে থাকেন। বিরোধিতাটা হয় দু’ধরনের। এক মানসিক, দুই অর্থনৈতিক। ছাত্রদেরকে তারা বেয়াদব, ইঁচড়েপাকা, ইত্যাদি ইত্যাদি গালি দিয়ে থাকেন। যা সদস্যদের মানসিকভাবে দুর্বল করে ফেলে। অপরদিকে তারা যেহেতু প্রভাবশালী এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবালম্বী এবং যে কোনো ধরনের অনুষ্ঠনে তারা অর্থ দান করে থাকেন ফলে পাঠাগারের অনুষ্ঠানে তারা অর্থ সরবরাহ করা বন্ধ করে দেন। কিন্তু ইতিবাচক দিক হলো পাঠাগারের সদস্যরা আগে থেকেই মানসিকভাবে প্রস্তুত খাকে। ফলে এ সমস্যা থেকে উত্তরণের কৌশলও তারা নির্ধার ণ করে রাখে।

দ্বিতীয় বাধা আসে প্রশাসনের তরফ থেকে। স্থানীয় নেতৃত্ব যখন এদেরকে ঠেকাতে পারে না তখন তারা প্রশাসনকে প্রভাবিত করে। প্রশাসনের নিকট তারা নালিশ জানায় পাঠাগারের কার্যক্রম বন্ধ রাখার জন্য। ঔপনিবেশিক মানসিকতার তল্পিবাহী এই প্রশাসন অনুষ্ঠান বন্ধের জন্য ফরমান জারি করেন। কয়েকটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি আপনারা বুঝতে পারবেন।

১৪১৪ সাল আমরা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান করব। তিনদিনব্যাপি মেলা হবে স্কুল মাঠে। দুইমাস আগেই মাঠ চেয়ে প্রধান শিক্ষক বরাবর দরখাস্ত দিলাম। তিনি বললেন দেশে জরুরী অবস্থা চলছে, অনুষ্ঠান করা চলবে না। আমরা নাছোড় বান্দা। বললাম রমনাতে যে হবে। তিনি তখন বললেন টিএনওকে বল, তিনি অনুমতি দিলে আমার কোন কথা নেই। আমরা ছুটলাম টিএনওর কাছে। তিনি আমাদের বললেন জেলা প্রশাসন বরাবর দরখাস্ত দিতে। আমরা তাই করলাম। তারপর শুরু হলো অপেক্ষার পালা। আজ আসেন কাল আসেন এভাবে সময় পার করতে লাগলেন। অনুষ্ঠানের আগের দিন তারা আমাদের জানালেন, আপনাদের থানা থেকে খবর এসেছে এলাকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাকি ভালো না তাই অনুষ্ঠান করাার অনুমতি দেওয়া গেল না। আমাদের সার্বিক পরিস্থিতি জানিয়ে তার পরামর্শ চাইলাম তখন তিনি আমাদের বুদ্ধি দিলেন- এলাকার মুরুব্বিদের নিয়ে থানায় যদি নিশ্চয়তা দিতে পারেন অনুষ্ঠাণে কোনো রকমের গোলমাল হবে না, তবে একটা রেজাল্ট পেতে পারেন। কয়েক ভ্যান মুরুব্বি নিয়ে সন্ধ্যা সময় হাজির হলাম থানাতে। সৌভাগ্যক্রমে সেখানে টিএনও কেউ পেয়ে গেলাম। রাত এগারটা পর্যন্ত মিটিং করে তারা আমাদের পরামর্শ দিলেন যদি ডিসি সাহেব টিএনওকে ফোন দিয়ে অনুষ্ঠান করার অনুমতি দেন তবেই অনুষ্ঠান করা যাবে। তখন আমরা ভেঙ্গে পড়লাম। শেষ চেষ্ঠা হিসাবে টাংগাইলের কয়েকজন সাংবাদিকের সাথে ফোনে কথা বললাম। বিশেষ করে ইত্তেফাকের খান মোহাম্মদ খালেদ আর মানবজমীনের মাহমুদ কামালের সাথে। তারা ডিসির সাথে যোগাযোগ করে আমাদেরকে টিএনওর সাথে যোগাযোগ করতে বললেন। রাত বারটা সময় গেলাম টিএনওর বাসায়। তিনি প্রথমে আমাদের দেখে ক্ষিপ্ত হলেন পরে ডিসির ফোন পেয়ে শান্ত হলেন।কিন্তু আমাদের মনে একটা প্রশ্ন থেকেই গেল-আগে অনুমতি দিলে দোষ ছিল কোথায়!

২০১২ সাল। গত পাঁচ বছর ধরে আমরা তিনদিনব্যিিপ অর্জুনা বইমেলা করে আসছি। ইস্কুলের মাঠ চেয়ে নভেম্বর মাসে আবেদনও করেছি। শুনেছি আমাদের অনুষ্ঠানকে ঠেক দেওয়ার জন্য বিদ্যালয়ের সভাপতি এবং প্রধান শিক্ষক দুইজন ছেলেকে দিয়ে আগেই আবেদন করিয়েছেন। যাদের অনুষ্ঠান করার আগের কোন অভিজ্ঞাতা নেই। শুধু আমরা যেন অনুষ্ঠান না করতে পারি তারজন্যই এটা করা হয়েছে। জানিনা এবারের জল কতদূর গড়াবে।

এবার রাজনৈতিক বাধা নিয়ে আলোচনা করা যক। রাজনৈতিক বাধাটা আসে মূলত অতিথী করা নিয়ে। সরকারী দলের যারা স্থানীয় সভাপতি তারা আশা করে থাকেন এলাকার যে কোন অনুষ্ঠাণে তারা অতিথী হয়ে যাবেন। তিনি যদি জনপ্রতিনিধি নাও থাকেন। কিন্তু আমাদের অতিথী করার শর্ত হলো তাকে অবশ্যই জনপ্রতিনিধি অথবা শিল্প-সাহিত্যে অবদান রাখতে হবে। এরা কী ধরণের নোংরা বাধা দেন সেটা আমাদের অভিজ্ঞতা থেকেই শুনুন।

ভূঞাপুরে আমাদের একটা বিজ্ঞান সংগঠন আছে। নাম লাইসিয়াম গণিত ও বিজ্ঞান সঙ্গ। এর উদ্যেগে আমরা বছরে কয়েকটা গণিত অলিম্পিয়াডের আয়োজন করে থাকি। ২০১০ সালে ভূঞাপুরে একটা বিজ্ঞান মেলার আয়োজন করতে চাই। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভাপতি জনপ্রতিনিধী না হওয়ায় দাওয়াতপত্রে আমরা তার নাম দিতে পারিনি। দাওয়াতপত্রে সভাপতির নাম না থাকায় সেবার আমরা ভূঞাপুরে অনুষ্ঠানই করতে পারিনি। পরে সেই অনুষ্ঠানটি অর্জুনাতে করেছিলাম।

তত্বাবধায়ক সরকার এবং বর্তমান ক্ষমতাশীল সরকারের সময়ের অভিজ্ঞতার কথা আমরা লিখলাম। আগের বিএনপি সরকারে আমলেরর অভিজ্ঞতাও সুখকর নয়। লেখাটা বড় হয়ে যাচ্ছে বলে এখানে আর লিখলাম না।

২০০৯ সাল। সেপ্টেম্বর মাস। পাঠাগারের আমরা কয়েকজন অলস সময় কাটাচ্ছিলাম। পাশেই ঢাকা-তারাকান্দি রোড।একজন মহিলা অনেকক্ষণ ধরেই দাড়িয়ে আছে।একটার পর একটা বাস চলে যাচ্ছে । কিন্তু তাকে নিয়ে যাচ্ছে না। মহিলা যে কোথাও বসে বিশ্রাম নিবে সে রকম জায়গাও নেই। দুই ছেলে নিয়ে তাকে দাড়িয়ে থাকতে হচ্ছে রাস্তার পাশে। পরে আমরা কয়েকজন মিলে গাড়ি থামিয়ে তাকে উঠিয়ে দেই। কিন্তু হেলপার ভাইয়ের একটা উক্তি আমাদের মনে খটকা লাগে “মামু এক গায়ে কয় জায়গায় থামামু”।

রুসান বলে উঠে গাড়ি থামানোর জন্য একটা জায়গা ঠিক করা উচিৎ। কথাটা আমাদের সকলের মনে ধরে যায়। আমাদের সাবেক সভাপতি শাহেদ বলে উঠে “আসেন আমরা এখানে একটা ঘড় তুলে ফেলি। তাহলে সকলে এখানে আসবে। বসারও একটা জায়গা হবে। আমরা যারা ভূঞাপুর যাই কলেজ করতে তাদেরও বৃষ্টির দিনে অনেক কষ্ট হয়। আর বড় কথা আড্ডারও একটা জায়গা হবে। আমাদের মধ্যে ছোট খাটো ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে নাম কামাই করেছে হাসান। “সব ঠিক থাকলে ঘড়টা আমি বানিয়ে দিতে পারবো। কোন সুতার লাগব না।” বলে হাসান। রাজু চিল্লাইয়া উঠে “আয় চড়ে যাই ছন কাইটা নিয়া আসি । গ্রাম থেকে বাশ উঠাবো। আর আমরা সবাই গায়ে গতরে খাটবো। তাইলেই আর কোন খরচ নাই।”

বর্ষার শেষ। যুনায় তখন তীব্র গ্রোত। এবার কাশের চরও পড়েছে। অনেক দূরে। নৌকা নিয়ে যেতে হবে।বকুল পাটনীকে অনুলোধ করি আমাদের নামিয়ে দিয়ে এসে পড়বেন আবার বিকেলে গিয়ে নিয়ে আসবেন।রাজি হয় না সে। “কইছে আমনেগোরে ঐ চরে যাইতে আইতেই আমাগো বেলা পড়ইয়া যাবো।ঐ সব অইব না । সারা দিনের নামে ভাড়া করতে হইব। ১০০০ টাকা দিয়ন নাগবো।” আমরা হতাশ হয়ে ফিরে আসি। শেষে পথ বাতলাইয়া দেয় শামিম। মধুপরে ছন পাওয়া যায় এবং সস্তাও আছে।

আমরা কিছু কিছু টাকা চাদা দিতে রাজি হয়ে গেলাম। আমাদের গ্রামের ভ্যানচালক দুলাল ভাই বলল “তোমরা আমারে সুবিধা মতো ১০০ টাকা দিও। আমি তোমাগো ছনডি আইনা দিমু।” আমাদের সাহস এবার বেড়ে গেল।

ঐ দিকে মাসুদ কাক বললেন তোরা এক কাজ কর। আমি তোগোরে কিছু টাকা দেইরো আর আমার জমির পাশে একটা শিশু গাছ আছে এটা দিয়া যদি কিছু করতে পারস কর। আমার কোন আপত্তি নাই। আমাদের খুসি আর দেখে কে। ইঞ্জিনিয়ার হাসান চলে যায় শো মেশিনে। করাত আর মাপ জোকের ফিতা নিয়ে আসে।তার নির্দেশ মতো কাজ করে যাই আমরা।জাহাঙ্গির, রবিন, পাপন, সাগর, সেই কাঠগুলো কাধে করে নিয়ে যায় বাজারে চিরাই করতে। সো মেশিনের মালিককে ১০০ টাকা দিতেই মহা খুশি হয়ে যান।নতুন উদ্যমে এগুতে থাকে আমাদের কাজ। সুতার বাড়ি থেকে সব যন্ত্রপাতি নিয়ে আসে হাসেন। আমরা সবাই হলাম ওর জোগালদার। ৩ দিনের মধ্যে ও দাড় করিয়ে ফেলে ৬ চালা ঘড়ের এক ফ্রেম। গ্রামের মুরুব্বিরা মাঝে মাঝে দখেতে আসে আমাদের কাজকর্ম। টুকটাক পরামর্শ দেন। মসজিদের মুসুল্লিদের দিক থেকে মৃদু আপত্তি আসে। মসজিদের পাশে যাত্রী ছাউনী দেয়া যাবে না। তেমারা চিল্লাপাল্লা করবা। নামাজিদের ব্যঘাত ঘটবে। আমরা তাদের বুঝিয়ে ঠান্ডা করি।

ফ্রেম হয়ে গেলে আমি আর শামিম দুলাল ভাইকে নিয়ে রওনা হই মধুপুর। ছন আনতে। কিন্তু সেখানে ঘটে আরেক বিপত্তি। মধুপুর ছন পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় রসুলপুর। দুলাল ভাই এবার বেকে বসলেন। ঐ পথ আমি চিনি না, আমি যাব না।।যাই হোক ২টা ডিম ঘুস দিয়ে তাকে রাজি করালাম।ছন নিয়ে বাড়িতে আসতে আসতে রাত দু’টো বেজে গেল আমাদের।

পরবর্তী কয়েকদিনের মধ্যে শেষ হয়ে যায় আমাদের যাত্রীছাউনী। গ্রাম থেকে বাঁশ তুলে দেয়া হয় এর খুটি। রাস্তার কিছু ইট বৃষ্টির পানিতে ধ্বসে পাগারে পড়ে ছিল। আমরা সেগুলোকে তুলে আনি বসবার জন্য। পরে রানু মামা আমাদের ২ বস্তা সিমেন্ট দিলে আমার বসার পাকা ব্যবস্থা করে দেই।

রোদ বৃষ্টি বর্ষায় গ্রামের মানুষের দারুন উপকারে আসে এই যাত্রীছাউনী।আমাদের সামান্য উদ্যগ আর পরিশ্রমে মানুষের এতো উপকার হচ্ছে। এটা ভাবতে আমদেরও ভালো লাগে। এরই মাঝে কেটে গেছে ৩ বছর। মাঝে একবার খুটি বদলিয়েছিরাম আমরা। ছনগুলো পচে খসে খসে পড়ে যাচ্ছে। সংস্কার করা জরুরী। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসে না।পরে পাঠাগারের পক্ষ থেকে আমরাই উদ্যেগ নেই এটি সংস্কারের।

সিধান্ত হয় বছর বছর সংস্কার করা সম্ভব না। দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা নিতে হবে। যাতে অনেক বছর এটা টিকে থাকে। আমারা আবার গ্রামের মানুষের কাছে যাই। অনেকেই এগিয়ে আসে এ যাত্রায় মারুফ কাকা, পারভেজ ভাই, জীবন ভাই, টিটু, শিবলী স্বপন রজব ভাইয়ের কথা অবশ্যই স্মরণ করতে হয়। তাছাড়া গ্রামের অনেকেই ৫০, ১০০, ৫০০ টাকা দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় আমদের দিকে।সবার সহযোগিতায় দাড়িয়ে যায়েএবারের এই যাত্রীছাউনী।

আমরা ঠিক করেছি আমাদের এই যাত্রীছাউনীর নাম রাখা হবে উপমহাদেশের বিখ্যাত কৃষক নেতা আমাদের এলাকার গর্ব হাতেম খাঁর নামে। রাস্তা দিয়ে মানুষ যাবে। কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম নিবে বা কেউ তাকিয়ে দেখবে দৃষ্টিনন্দন এই স্থাপত্যটিকে। জানবে এক মহান কৃষক নেতার কথা যে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো পার করেছে কৃষকের অধিকারের কথা বলে বলে, বৃটিশ আর পাকিস্তানের জেলে জেলে, কিংবা হুলিয়া মাথায় নিয়ে ফেরারি হয়ে। আর জানবে একদল উদ্যমই তরণের কথা। যারা স্বপ্ন দেখে গ্রামে গ্রামে পাঠাগার দিয়ে, নিজেদের অর্থে, নিজেদের শ্রমে, ঘামে, বুদ্ধিতে দেশটাকে পালটে দিতে, যারা স্বপ্ন দেখে একটা সত্যিকারের, মানবিক, অসাম্প্রদায়িক, বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ বিনির্মাণের।

পাঠাগারের কার্যক্রম বন্ধ রাখার জন্য। ঔপনিবেশিক মানসিকতার তল্পিবাহী এই প্রশাসন অনুষ্ঠান বন্ধের জন্য ফরমান জারি করেন। কয়েকটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি আপনারা বুঝতে পারবেন।

১৪১৪ সাল আমরা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান করব। তিনদিনব্যাপী মেলা হবে স্কুল মাঠে। দুইমাস আগেই মাঠ চেয়ে প্রধান শিক্ষক বরাবর দরখাস্ত দিলাম। তিনি বললেন দেশে জরুরি অবস্থা চলছে, অনুষ্ঠান করা চলবে না। আমরা নাছোড়বান্দা। বললাম রমনাতে যে হবে। তিনি তখন বললেনÑটিএনওকে বলো, তিনি অনুমতি দিলে আমার কোনো কথা নেই। আমরা ছুুটলাম টিএনওর কাছে। তিনি আমাদের বললেন জেলা প্রশাসন বরাবর দরখাস্ত দিতে। আমরা তাই করলাম। তারপর শুরু হলো অপেক্ষার পালা। আজ আসেন কাল আসেন এভাবে সময় পার করতে লাগলেন। অনুষ্ঠানের আগের দিন তারা আমাদের জানালেন, আপনাদের থানা থেকে খবর এসেছে এলাকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাকি ভালো না তাই অনুষ্ঠান করাার অনুমতি দেওয়া গেল না। আমাদের সার্বিক পরিস্থিতি জানিয়ে তার পরামর্শ চাইলাম তখন তিনি আমাদের বুদ্ধি দিলেনÑএলাকার মুরুব্বিদের নিয়ে থানায় যদি নিশ্চয়তা দিতে পারেন অনুষ্ঠানে কোনো রকমের গোলমাল হবে না, তবে একটা রেজাল্ট পেতে পারেন। কয়েক ভ্যান মুরুব্বি নিয়ে সন্ধ্যার সময় হাজির হলাম থানাতে। সৌভাগ্যক্রমে সেখানে টিএনওকে কেউ পেয়ে গেলাম। রাত এগারটা পর্যন্ত মিটিং করে তারা আমাদের পরামর্শ দিলেন যদি ডিসি সাহেব টিএনওকে ফোন দিয়ে অনুষ্ঠান করার অনুমতি দেন তবেই অনুষ্ঠান করা যাবে। তখন আমরা ভেঙে পড়লাম। শেষ চেষ্টা হিসাবে টাঙ্গাইলের কয়েকজন সাংবাদিকের সাথে ফোনে কথা বললাম। বিশেষ করে ইত্তেফাকের খান মোহাম্মদ খালেদ আর মানবজমিনের মাহমুদ কামালের সাথে। তারা ডিসির সাথে যোগাযোগ করে আমাদেরকে টিএনওর সাথে যোগাযোগ করতে বললেন। রাত বারোটা সময় গেলাম টিএনওর বাসায়। তিনি প্রথমে আমাদের দেখে ক্ষিপ্ত হলেন পরে ডিসির ফোন পেয়ে শান্ত হলেন। কিন্তু আমাদের মনে একটা প্রশ্ন থেকেই গেলÑআগে অনুমতি দিলে দোষ ছিল কোথায়!

২০১২ সাল। গত পাঁচ বছর ধরে আমরা তিনদিনব্যাপী অর্জুনা বইমেলা করে আসছি। স্কুলের মাঠ চেয়ে নভেম্বর মাসে আবেদনও করেছি। শুনেছি আমাদের অনুষ্ঠানকে ঠেক দেওয়ার জন্য বিদ্যালয়ের সভাপতি এবং প্রধান শিক্ষক দুইজন ছেলেকে দিয়ে আগেই আবেদন করিয়েছেন। যাদের অনুষ্ঠান করার আগের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। শুধু আমরা যেন অনুষ্ঠান না করতে পারি তার জন্যই এটা করা হয়েছে। জানি না এবারের জল কতদূর গড়াবে।

এবার রাজনৈতিক বাধা নিয়ে আলোচনা করা যাক। রাজনৈতিক বাধাটা আসে মূলত অতিথি করা নিয়ে। সরকারি দলের যারা স্থানীয় সভাপতি তারা আশা করে থাকেন এলাকার যে কোনো অনুষ্ঠানে তারা অতিথি হয়ে যাবেন। তিনি যদি জনপ্রতিনিধি নাও থাকেন। কিন্তু আমাদের অতিথি করার শর্ত হলো তাকে অবশ্যই জনপ্রতিনিধি অথবা শিল্প-সাহিত্যে অবদান রাখতে হবে। এরা কী ধরনের নোংরা বাধা দেন সেটা আমাদের অভিজ্ঞতা থেকেই শুনুন।

ভূঞাপুরে আমাদের একটা বিজ্ঞান সংগঠন আছে। নাম লাইসিয়াম গণিত ও বিজ্ঞান সঙ্গ। এর উদ্যেগে আমরা বছরে কয়েকটা গণিত অলিম্পিয়াডের আয়োজন করে থাকি। ২০১০ সালে ভূঞাপুরে একটা বিজ্ঞান মেলার আয়োজন করতে চাই। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভাপতি জনপ্রতিনিধী না হওয়ায় দাওয়াতপত্রে আমরা তার নাম দিতে পারিনি। দাওয়াতপত্রে সভাপতির নাম না থাকায় সেবার আমরা ভূঞাপুরে অনুষ্ঠানই করতে পারিনি। পরে সেই অনুষ্ঠানটি অর্জুনাতে করেছিলাম।

তত্বাবধায়ক সরকার এবং বর্তমান ক্ষমতাশীল সরকারের সময়ের অভিজ্ঞতার কথা আমরা লিখলাম। আগের বিএনপি সরকারে আমলেরর অভিজ্ঞতাও সুখকর নয়। লেখাটা বড় হয়ে যাচ্ছে বলে এখানে আর লিখলাম না।