অবিরাম জল ভ্রমণ

55 জন পড়েছে

এক মিনিটের বেশি নয়


টাঙ্গাইল জেলার ছোট্ট এক গ্রাম অর্জুনা। জেলা শহর থেকে ২৯ কি.মি উত্তর-পশ্চিমে এর অবস্থান। সেই গ্রামে আমাদের আছে ছোট্ট্র এক পাঠাগার। নাম ‘ অর্জুনা অন্বেষা পাঠাগার’ । বই পড়ার পাশাপাশি আয়োজন করি বিভিন্ন অনুষ্ঠানের। এই যেমন অর্জুনা বইমেলা, বর্ষবরণ অনুষ্ঠান, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস উদযাপন্ নৌকা ভ্রমণ এমনই নানা অনুষ্ঠানের। প্রতিবারের মতো এবারো আমাদের নৌকা ভাসছিলো যমুনায়। গন্তব্য রৌমারী যেখানে যমুনা নদী প্রবেশ করেছে বাংলাদেশে। সব ঠিকঠাক, চলছিলো শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। ২৫ সেপ্টম্বর ভোরে সূর্য উঠার সাথে ভাসবে আমাদের নৌকা। মেষ মুহূতেৃ আমাদের ভাড়া ভাতে ছাই দিয়ে বসলেন আমাদের নাওয়ালা। তার এক জবান, এতো দুরের পথ প্রধান মাল্লা ছাড়া নাও পাঠাবেন না। মাল্লা গেছেন বেয়াই বাড়ি ঈদ পরবর্তী দাওয়াত খেতে। তাকে যতোই বলি সমস্যা নেই। আমারা ৪৬ জন যাচ্ছি। তিনি ততোই ধনুকের মতো বেকেঁ বসেন । আরে মিয়া রৌমারী কি একটা দুইটা পথ! ৩ দিনের রাস্তা। যাইতে দুই দিন আইতে একদিন। আর যমুনা ছোট নদী না। তার শত শত নালা বিশাল বিশাল চর। তারপরও আছে ডাহাতের ভয়। আপনারাতো পোলাপান মানুষ। এগুলান বুঝবান না। উপায়ান্তর না দেখে আমি আর হাসান ছুটলাম গোবিন্দাসী বাজারে। বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ গরুর হাট। ভারত থেকে সরাসরি গরু আসে এই বাজারে। আসাদ ভাইয়ের সৌজন্যে এরকমই একটা গরুর নৌকা ঠিক করলাম আমরা। আগামীকাল গুরু আনতে যাবে তারা বাংলাদেশ ভারত সীমান্তে-সাহেবের আখলা বাজারে। সেই নৌকায় তুলে নেবে আমাদের্। নৌকায় ছই নেই, বসার ভালো ব্যবস্থা নেই। তবুও আমরা এতেই রাজি হলাম। পরের দিন নৌকা ভাসলো আমাদের । সূর্য উঠার সাথে সাথে আসতে বলেছিলাম বলে সবাই এসেছিলো প্রায় না খেয়ে।
বিকেল ৪টার সময় আমাদের নৌকা নোঙর ফেলে ডাকাতের চরে।বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দির একটা চর। জায়গাটার নাম শুনে অনেকেই মৃদু আপত্তি তুরেছিলো। কিন্তু ততোক্ষণে উদর দেবতা সপ্তমে চড়েছে। তাকে পূজো না দিলেই নয়। আমরা সবাই ধরাধরি করে ডেকচি, লাকড়ি এসব নামালাম। রান্না কাজে লেগে গেল আমাদের হেড বাবুর্চি শাহেদ। সহকারী বাবুর্চি রাজন, রুসান, শামীম।ততোকক্ষণে আমাদের ঘিরে ধরেছে এলাকার ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে, বৌ-ঝিরা।তাদের কেউ কেউ আমাদের বাবুর্চিদের রান্না দেখে ফোড়ন কাটছে, কেউ কেউ আবার এর ওর মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছে। এলাকার নাম ডাকাতের চর হল কেন তাই নিয়ে বলছিলো রোমহর্ষক কিংবদন্তি।রান্না শেষ হতে হতে প্রায় মাগরিবের আযান পড়ল। সিধান্ত হলো নৌকাতেই আমরা দুপুর কাম রাতের খাবার খাবো।নৌকা চলছে যমুনার জল কেটে।পাঁচদিন বয়সী চাঁদ আলো ছড়াচ্ছে ডাকাতের চরের দুইধারে কাশবনে।বিশাল বিস্তীর্ণ চর।আশেপাশে কোন লোকালয় নেই।কাশবনের ভিতরে লুকিয়ে থাকে ডাকাতেরা।সুযোগ পেলেই গরুর নৌকা, যাত্রীবাহী নৌকার উপর ঝাপিয়ে পড়ে । লুট করে নেয় যাত্রীদের সর্বস্ব। এ গল্পগুলো বলছিলো আমাদের মাল্রা সুরুজ ভাই। রাত ৯টা নাগাদ আমরা এসে পৌঁছলাম মানিক দেইর চরে।ঘাটে সারি সারি নৌকা বাধাঁ।নদীর কূলেই মানিক দেইর প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের সামনে বিশাল খেলার মাঠ।হেরিকেনের টিম টিম আলো দেখে এগিয়ে যাই আমরা।দেখি ছাত্ররা মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করছে।এই স্কুলেরই ছাত্র তারা। ৪র্থ ও ৫ম শ্রেণিতে পড়ে।কোচিং করছে। রাতে এখানেই থাকে।আমরা শুনে তো তাজ্জব।কিছুক্ষণের মধ্যে শিক্ষক, বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সদস্য আরো কিছু লোকের সাথে পরিচয় হয় আমাদের।তারা আমাদের গল্প শুনান স্কুলের। আদর্শ শিক্ষক নজরুল ইসলাম স্যারের।
স্কুলেই রাতে থাকার ব্যবস্থা হয় আমাদের।রুবেল এই স্কুলের সাবেক ছাত্র।বর্তমানে ভিক্টোরিয়া কলেজে অর্থনীতিতে পড়ে। ও আমাকে গল্প শুনাচ্ছিল তার গ্রামের স্বশিক্ষিত হযে উঠার গল্প।তার স্বপ্নের নায়ক নজরুল ইসলাম স্যারের কথা।যিনি তাঁর স্বপ্নকে এ গ্রামের সবার মাঝে বিতরণ করেছেন।আমি তস্ময় হয়ে শুনছিলাম ।চাঁদ তখন ঢলে পড়ছে যমুনার চরে, কাশবনের ওপারে।আমাদের কেউ কেউ গিয়েছিলো সেই রাত্রে যাত্রা দেখতে।২/৩টা কাঠের চৌকিকে একত্রে করে বানিয়েছে মঞ্চ। তাতেই মঞ্চস্থ হচ্ছে-কাসেম মালার প্রেম।ছেলে, বুড়ো, মেয়ে সবাই দেখছে। আমরাও কেও যাত্রা দেখে, কেউ ঘুমিয়ে আবার কেউ না ঘুমিয়ে প্রথম রাত পার করলাম মানিক দেইর চরে।
দ্বিতীয় দিনের যাত্রা শুরু হয় ফজরের আযানের সাথে সাথে।সুবেহসাদকের আলো-আঁধারিতে।যমুনার জল কেটে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের নৌকা্। রাতজাগা পাখিরা নদীর এপার-ওপার হচ্ছে।শরতের হিমেল হাওয়া নরম স্পর্শ বুলাচ্ছে আমাদের গায়।কি শান্তি! ওম শান্তি।কাশবনে বসেছে বাবুই আর চড়ুইয়ের আসর।এভাবে দু’ঘন্টা যাওয়ার পর দেখি সূর্য মামা লাল জামা গায়ে দিয়ে হেলে-দুরে উকিঁ দিচ্ছে পূর্বাকাশে।সকাল ৮টার সময় আমারা গুঠাইল বাজারে।ইসলামপুর থানার একটা বাজার।সকালের নাস্তার জন্য আধ ঘন্টার বিরতি।তারপর আবার যাত্রা।অবিরাম যাত্রা।বাহাদুরাবাদ ঘাট, ডানে ফুলছড়ি, বামে দেওয়ানগঞ্চ পার হয়ে আমরা পৌঁছি যমুনা-ব্রহ্মপুত্র সংগমস্থলে।১৭৮৭ সালের এক প্রলয়ঙ্করী বন্যায় ব্রহ্মপুত্র তারগতিপথ পরিবর্তন করে বর্তমান যমুনা নাম ধারণ করে প্রবাহিত হয়ে আরিচার কাছে গোয়ালন্দে পদ্মার সঙ্গে মিশেছে।আরেকটি শাখা মূল ব্রহ্মপুত্র জামালপুর, ময়মনসিংহের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভৈরবের কাছে মেঘনার সঙ্গে মিশেছে।ওদিকে সূর্য মধ্য গগনে এসে আমাদের উপর তার তেজ বর্ষণ করছে।আর উদর দেবতা তার প্রাপ্ত পূজা দাবি করে বসেছে।আমাদের অবস্থা এখন ত্রাহি ত্রাহি। এদিকে নাওয়ালার ঘোষণা্ সময়মতো পৌঁছতে চাইলে দুপুরের রান্না করা যাবে না।তার মানে আজকেও আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে। এই ঘোষণা শুনে রাজীব, জাহাঙ্গীর, বেলায়েতসহ কয়েকজন বিদ্রোহ করে বসল। কিন্তু নাওয়ালাও নাছোড়বান্ধা।দু’পক্ষের মধ্যে বিষণ বাকযুদ্ধ।
নৌকা এগিয়ে চলছে। এটা রাজিবপুর, সামনে রৌমারি।নামগুলো আমাদের মস্তিস্কের কোষে কোষে ধাক্কা দেয়। সামনের চরগুলোর কোনটির নাম হয়তো মাইনকার চর।হয়তো ঐ চরগুলোর কোনটিতে বীরমুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবির বাড়ি।
৭১ সালে এই পথেই মুক্তিযোদ্ধারা পাড়ি জমাতেন ভারতে।ট্রেনিং নিয়ে ফিরে আসেন দেশে। আমাদের এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে বারবার এইসব এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের নাম শুনেছি।মাল্লা সুরুজ ভাই বললেন সামনের চরই সাহেবের আখলা।তখন প্রায় সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে।আমাদের দৃষ্টিসীমায় ভারতের সীমানা পিলার।ঐতো ঐখান দিয়াই যমুনা নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
হিমালয় থেকে উৎপন্ন হয়ে তিব্বত আসামের উপর দিয়ে কতো চড়াই উৎরাই পেরিয়ে অবশেষে এসছে বাংলাদেশে।আমাদের ভিতরে তখন চরম উত্তেজনা। আমার এসে গেছি, এসে গেছি।সাহেবের আখলা বিডিয়ার ক্যাম্পের কাছে আমরা নোঙ্গর ফেলি।একদল নেমে যায় রান্নার কাজে।আমি লিমনকে নিয়ে বের হই ভ্যান খুজঁতে।কারণ নাওয়ালার সাথে আমাদের চুক্তি ছিলো তিনি শুধু আমাদের নিয়ে আসবেন।ফেরার সময় আমাদের বিকল্প ব্যাবস্থা করতে হবে।তখন তো রাজি হয়েছিলাম।এখন বুঝতে পারছি কি বোকামিই না করেছিলাম।দু’ঘন্টা ঘুরে আমরা একটা ভ্যান পাই নামাজের চরে।
নাওয়ালার পরামর্শ স্থানটা নিরাপদ নয়।আপনাদের গিয়ে থাকতে হবে দাঁতভাঙ্গা বাজারে।আর আগামীকাল বাড়ি পৌঁছতে চাইলে আমাদের কিছুটা পথ এগিয়ে থাকতেই হবে।সিধান্ত হয় ঐ ভ্যানে মালপত্র তুলে আমরা হেটে যাবো।
খাওয়া-দাওয়া সেরে রাত দশটার সময় হাঁটা শুরু করি আমরা।দু’দিনের ক্লান্তিতে আমাদের শরীরর ছিলো অবসন্ন।গ্রামের কাঁচা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি আমরা।দু’ধারে আখের খেত।মাঝে মাঝে আম-জামের জমাট বাধাঁ অন্ধকার।পাশেই কোন ডোবায় ঝাঁক ঝাঁক জোনাকির মিছিল।রাতজাগা দু’একটা পাখি ডেকে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে।রাত ২টার সময় আমরা পৌঁছি দাঁতভাঙ্গা বাজারে।বাজারের সব দোকান তখন বন্ধ।একটা স্কুলের বারান্ধায় ঘুমানোর ব্যবস্থা করি।৩য় দিনের যাত্রা শুরু হয খুব ভোরে।৪টা নসিমন নিয়ে আসি রৌমারি বাজারে।তখন সকাল ১০টা।বাসের মামুদের সাথে কথা হয় আমাদের।ঈদের মাকের্ট বলে তাদের বাজার খুব চড়া। পরে আমরা বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ট্রাক মেনেজ করি।দামও সস্তা। নতুন অভিজ্ঞতাও হবে।ট্রাক এগিয়ে চলছে ভারতের সীমানা ধরে ধরে।আমাদের কাছ থেকে ভারত তখন ২০ ফিট কখনো ৫০ ফিট কখনোবা এরও কাছাকাছি।উপরে খোলা আকাশ, পাশেই মেঘালয়।টারশিয়ারি যুগের পাহাড়গুলো দেখে দেখে বাড়ি ফিরছি আমরা।মনে মনে বকা দিচ্ছি র‌্যাডক্লিফ। বেটা জোচ্চার।সব পাহাড় দিয়ে দিযেছে ভারতকে।ওগুলোওতো হতে পারতো আমাদের দেশ।
এবারের ভ্রমণে কষ্ট হয়েছে খু্ব।অভিজ্ঞতাও হয়েছে ঢের।এক সাথে নদ দেখা, পাহাড় দেখা, দেখেছি যমুনার চরের সংগ্রামী মানুষের বিচিত্র জীবন।আগামীবারও হয়তো নৌকা ভাসবে।যাব নতুন কোন জয়গায়।পরিচিতো হব নতুন মানুষজনের সাথে।কিন্তু এ যাত্রার কথা মনে রবে অনেকদিন।
(লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় বাংলাবাজার পত্রিকাতে। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১১)